চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার শীর্ষ ক্লাবগুলোতে ব্রিটিশ ফুটবলারদের পদচারণা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একসময় ব্রিটেনের বাইরে গিয়ে মহাদেশীয় কোনো ক্লাবে নাম লেখানো ব্রিটিশ তারকাদের জন্য বিরল ও দুঃসাহসিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে সেই যুগ পেরিয়ে বর্তমান সময়ে নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের প্রতিযোগিতায় সফল হওয়া একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ যাত্রায় রূপ নিয়েছে।
বিদেশে আলো ছড়ানো ব্রিটিশ ফুটবলারদের সংখ্যা এখন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ স্কোয়াডের অন্তত আটজন শীর্ষ তারকা বর্তমানে দেশের বাইরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় মাঠ কাঁপাচ্ছেন। জার্মানির মিউনিখ, স্পেনের মাদ্রিদ, ইতালির মিলান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ক্লাবে তাঁদের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি, যাদের বড় অংশ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইতালির মর্যাদাপূর্ণ সিরি আ প্রতিযোগিতায়। দুই হাজার সালের পর থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে নিজেদের পারফরম্যান্স ও শিরোপাজয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে গভীর প্রভাব ফেলা সেরা ব্রিটিশ ফুটবলারদের একটি বিশেষ তালিকা সামনে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টস।
তালিকার দশম স্থানে জায়গা পেয়েছেন অভিজ্ঞ ইংলিশ রাইট-ব্যাক কিয়েরন ট্রিপিয়ার।
টটেনহ্যামের হয়ে ২০১৯ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে পরাজয়ের পর ক্লাবটিতে নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে তিনি যোগ দেন স্প্যানিশ পরাশক্তি আতলেতিকো মাদ্রিদে। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে আতলেতিকোর জার্সিতে প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। কোচ দিয়েগো সিমিওনের অধীনে নিজের রক্ষণভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে ক্লাবটিকে সহস্রাব্দের দ্বিতীয় লা লিগা ট্রফি এনে দেন ট্রিপিয়ার। স্পেনের সেই সফল অধ্যায় শেষ করে পরবর্তীতে তিনি দেশের মাটিতে ফিরে এসে নিউক্যাসলে নিজের সফল উপস্থিতি ধরে রাখেন।
ইতালির সান সিরো স্টেডিয়ামে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে তালিকার নবম স্থানে রয়েছেন ইংলিশ ডিফেন্ডার ফিকায়ো তোমোরি।
অতীতের জন চার্লস, জিমি গ্রিভস কিংবা জেরি হিচেনসের পর আধা শতাব্দীর বেশি সময় পার করে জুভেন্টাসের হয়ে অ্যারন রামসি স্কুদেত্তো জিতলেও তাঁর যাত্রা ধারাবাহিক ছিল না। অন্যদিকে ইন্টার মিলানে অ্যাশলে ইয়ংয়ের সফর ছিল মাত্র দেড় বছরের। সেই তুলনায় চেলসি ছেড়ে মিলানে আসা তোমোরি ২০২১-২২ মৌসুমে ক্লাবের স্কুদেত্তো জয়ে অসামান্য অবদান রেখে সিরি আ-র বর্ষসেরা একাদশে নির্বাচিত হন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ইউরোপের এই ঐতিহাসিক ক্লাবে বর্তমানে নিজের সপ্তম মৌসুমে খেলছেন আটাশ বছর বয়সী এই ইংলিশ তারকা।
তরুণ বয়সে প্রথা ভেঙে বিদেশে পাড়ি জমানোর সাহসিকতা দেখিয়ে তালিকার অষ্টম স্থানে রয়েছেন উইঙ্গার জেডন সানচো।
ম্যানচেস্টার সিটির দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নাকচ করে মাত্র ১৭ বছর বয়সে জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত সাহসী। দ্বিতীয় মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ৩৪ ম্যাচে ১২ গোলের পাশাপাশি ১৮টি অ্যাসিস্ট করে তিনি নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। একুশ বছর বয়সে ডর্টমুন্ড ছাড়ার আগে ১৩৭ ম্যাচে ৫০টি গোল এবং ৬৪টি গোলের যোগান দিয়ে ক্লাবকে একটি জার্মান কাপ উপহার দেন সানচো। ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বয় এবং তরুণ খেলোয়াড়দের সেরা পুরস্কার কোপা ট্রফির চূড়ান্ত তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে তিনি ব্রিটিশ তরুণদের জন্য ইউরোপীয় লিগে যাওয়ার প্রশস্ত পথ তৈরি করে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলকে বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরে তালিকার সপ্তম স্থানে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন কিংবদন্তি ডেভিড বেকহ্যাম।
রিয়াল মাদ্রিদে চার মৌসুমে একটি লা লিগা শিরোপা জেতার পর তিনি যোগ দিয়েছিলেন মেজর লিগ সকারের লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সিতে। ইউরোপ ছেড়ে আমেরিকায় যাওয়ায় নানা সমালোচনা হলেও বেকহ্যামের আগমন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের বাণিজ্যিক ও দর্শকপ্রিয়তার ভিত্তি সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। গ্যালাক্সিকে দুবার এমএলএস কাপ এবং দুবার সাপোর্টার্স শিল্ড জেতানোর পাশাপাশি ইতালির এসি মিলানে দুই দফায় ধারে খেলেন তিনি। এরপর ২০১৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিস সেন্ট জার্মেইর হয়ে লিগ ওয়ান শিরোপা জিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবলকে বিদায় জানান।
ইতালির নাপোলিতে গিয়ে নিজেকে লোকগাথায় পরিণত করে তালিকার ষষ্ঠ স্থানে স্থান করে নিয়েছেন স্কটল্যান্ডের মিডফিল্ডার স্কট ম্যাকটমিনে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিকল্প বেঞ্চের খেলোয়াড় থেকে তিনি দক্ষিণ ইতালির ক্লাবটিতে গিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার সমতুল্য ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। সতীর্থ বিলি গিলমোরের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রথম মৌসুমেই মধ্যমাঠ থেকে ১২টি গোল করে নাপোলিকে তাদের ক্লাব ইতিহাসের চতুর্থ স্কুদেত্তো শিরোপা এনে দেন এই তারকা। তাঁর অনন্য পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সিরি আ-র সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়ের সম্মান অর্জন করেন। নেপলসের ফুটবলে নিজের নাম স্থায়ীভাবে খোদাই করে নিয়েছেন এই স্কটিশ যোদ্ধা।
