মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই তীব্র চ্যালেঞ্জিং যুগে মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে আরও উন্নত করার নতুন বৈজ্ঞানিক উপায় ও গাইডলাইন প্রকাশ করেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্ট হ্যানা ক্রিচলো। তার সদ্য প্রকাশিত ‘দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ব্রেন’ নামক নতুন বইয়ে তিনি মানুষের সুপ্ত বুদ্ধিমত্তাকে জাগিয়ে তোলার এই বৈজ্ঞানিক কৌশলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
গবেষকরা জানিয়েছেন যে পাথরের যুগের মানুষের তুলনায় আধুনিক যুগের মানুষের মস্তিষ্কের গঠনগত কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী গত ১০ হাজার বছরে মানুষের মস্তিষ্ক আকারে কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।কিন্তু আধুনিক এই জটিল সময়ে মানুষের মানসিক নমনীয়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
হ্যানা ক্রিচলো জানান যে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন এবং এআই প্রযুক্তির আধিপত্য মানুষের মনে এক ধরনের আশঙ্কা ও ভীতি তৈরি করেছে। তবে নিউরোসায়েন্সের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষ তার জৈবিক মস্তিষ্কের সুপ্ত সম্ভাবনাকে অনায়াসে দ্বিগুণ করতে পারে। মানুষের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও সহানুভূতি মূলত বংশগতভাবে ১০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত হলেও মানুষ অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের সহানুভূতিশীল আচরণ অনেক বাড়াতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জামিল জাকির এক গবেষণা তুলে ধরে তিনি বলেন যে মানুষ যদি নিজের মানসিক আবেগকে বুঝতে শেখে এবং নিজের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হয়, তবে তার প্রভাব চারপাশের মানুষের ওপর ইতিবাচকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের ইনসিডের গবেষক হিলকে প্লাসম্যানের এক চমৎকার গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে এই বিজ্ঞানী জানান যে মানুষের পরোপকারী মনোভাব বা পরার্থপরতা সরাসরি পরিপাকতন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বা গাট মাইক্রোবায়োমের ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সুস্থ ও স্বাভাবিক কিছু মানুষকে মাত্র সাত সপ্তাহ প্রোবায়োটিক খাওয়ানোর পর তাদের পরিপাকতন্ত্রে বৈচিত্র্যময় ভালো ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় এবং তারা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরোপকারী আচরণ করতে শুরু করেন।
পরিপাকতন্ত্র এবং হৃদযন্ত্রের কোটি কোটি কোষ সরাসরি ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং ব্যাকটেরিয়ার তৈরি রাসায়নিক উপাদান মানুষের সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দিবাস্বপ্ন দেখা বা অলসভাবে চিন্তা করা দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে, কারণ দিনের অন্তত ২০ শতাংশ সময় মানুষ কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই চিন্তা করে কাটায়।
প্রকৃতির মাঝে কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়ালে মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, যা শান্ত মনে নতুন ও সৃজনশীল আইডিয়া তৈরি করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানী থমাস এডিসনও তার অদ্ভুত সৃজনশীল আইডিয়াগুলো পাওয়ার জন্য ঘুমের হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাকে কাজে লাগাতেন। একই সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ু কোষ এবং সার্কিট তৈরিতে সাহায্য করে, যা মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা ও নমনীয়তা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। মস্তিষ্কের এই পুরো শক্তির উৎস হলো কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়া, যা মানুষের চিন্তা করার জন্য প্রচুর শক্তি উৎপাদন করে।
কোষের এই পাওয়ার হাউসগুলোকে সচল রাখতে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, কম চিনিযুক্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। ঘুম মূলত মস্তিষ্কের এই শক্তি উৎপাদনের পর তৈরি হওয়া সমস্ত ক্ষতিকারক বিষাক্ত বর্জ্য পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এআই প্রযুক্তির এই যুগে কৃত্রিম মেধার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে মানুষের নিজস্ব জৈবিক মেধার বিকাশ ঘটানোই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
