বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের ফুটপাতে পণ্য সরবরাহে নিয়োজিত স্বয়ংক্রিয় ডেলিভারি রোবট সাধারণ পথচারীদের নিরাপদ চলাচলে তীব্র বিঘ্ন ঘটানোয় বিভিন্ন বড় শহরে এগুলো নিষিদ্ধ ও সীমিত করা হচ্ছে বলে বৃহস্পতিবার বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি মালামাল ও ফাস্ট ফুড দ্রুত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে এই স্বয়ংক্রিয় যানগুলোর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত সেন্সর এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে এই চার চাকার যান্ত্রিক যানগুলো শহরের ব্যস্ত ফুটপাত দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল করে থাকে। তবে এগুলো সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য নির্ধারিত একমাত্র পথ দখল করায় এবং বিভিন্ন স্থানে মানুষের সাথে সরাসরি সংঘর্ষের সৃষ্টি করায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরের বাসিন্দা জন রবার্টস এই ডেলিভারি রোবট প্রযুক্তির বিরুদ্ধে একটি তীব্র নাগরিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি শহরের ফুটপাতে এই যান্ত্রিক যানের অবাধ চলাচল ও ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি ক্ষুব্ধ মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি পিটিশন বা আবেদনপত্র স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। রবার্টস জানিয়েছেন যে প্রথমদিকে এই রোবটিক প্রযুক্তিকে বেশ আধুনিক এবং চমৎকার মনে হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরণের ভোগান্তি তৈরি করছে। বিশেষ করে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ ফুটপাতে হাঁটার জন্য বের হচ্ছে তখন এই রোবটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে মানুষকে বাধ্য হয়ে মূল রাস্তায় নেমে যেতে হচ্ছে।
এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কারণে উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটি বড় শহর প্রশাসন ইতিমধ্যে এই রোবটের অবাধ চলাচলের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও কড়া নিয়ম আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে। কানাডার বিখ্যাত টরন্টো শহর প্রশাসন ২০২১ সাল থেকেই ফুটপাতে এই ধরণের রোবট চলাচল সম্পূর্ণ আইনিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো শহর কর্তৃপক্ষ এই রোবটগুলোকে শুধুমাত্র কম জনাকীর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত শান্ত এলাকাগুলোতে সীমিত পরিসরে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি শিকাগো শহরের দুটি নির্দিষ্ট ছোট এলাকাতেও এই রোবটগুলোর প্রবেশ ও কার্যক্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারী নিরাপত্তা আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এই রোবটগুলোর কারণে সড়কে ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হওয়া এবং জরুরি সেবা প্রদানকারী ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্সের মতো গাড়িগুলোর পথ আটকে যাওয়ার একাধিক লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সড়ক পারাপারের স্থানে বা জেব্রা ক্রসিংয়ে এই মেশিনগুলো অনেক সময় অত্যন্ত এলোমেলো আচরণ করে যার ফলে মূল সড়কেও জটিলতা তৈরি হয়। এমনকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রোবটের গায়ে থাকা নিরাপত্তা পতাকার সরাসরি আঘাতে এক পথচারী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে যা জননিরাপত্তাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই রোবট পরিচালনাকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য দাবি করেছে যে তাদের তৈরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এটি শহরের যানজট ও কার্বন নিঃসরণ অনেক কমাতে সাহায্য করে। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই তীব্র গণক্ষোভ এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার মুখে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত বড় শহরগুলোতে তাদের এই রোবটিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না। এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও নাগরিক অধিকারের এই দ্বন্দ্ব এখন আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
