বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

মহাকাশে মানব মস্তিষ্কের পরিবর্তন নিয়ে নতুন গবেষণা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

মহাকাশে মানব মস্তিষ্কের পরিবর্তন নিয়ে নতুন গবেষণা

ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবীর স্বাভাবিক অভিকর্ষের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে মানুষ। তবে মহাকাশের শূন্য অভিকর্ষে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মানবদেহে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের কৌতূহল রয়েছে। সম্প্রতি লন্ডনের বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৫টি ভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, মহাকাশে থাকাকালীন মানব মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মহাকাশচারীদের ওপর চালানো বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, অভিকর্ষহীন পরিবেশে মস্তিষ্ক নিজেকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বা অভিযোজন করতে পুনরায় বিন্যস্ত করে। গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক এলিসা রাফায়েলা ফেরের মতে, মস্তিষ্কের এমন নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা নমনীয়তা এক চমৎকার বিষয়। তবে এই অভিযোজন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নড়াচড়া এবং শারীরিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোতে গঠনগত ও কার্যগত পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে অপারকুলাম নামক মস্তিষ্কের অংশটিতে পরিবর্তন দেখা যায়, যেখানে বহুমুখী সংকেতগুলো প্রক্রিয়াজাত হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় মায়ের গর্ভে থাকার সময় থেকেই মানুষ অভিকর্ষের সংকেত গ্রহণ করতে শেখে। আমাদের মস্তিষ্ক অভিকর্ষের উপস্থিতিকে পরিবেশের একটি ধ্রুবক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করে। মহাকাশে অভিকর্ষের অনুপস্থিতিতে মস্তিষ্ক সেই পুরোনো সংকেতগুলো থেকে বঞ্চিত হয়, যার ফলে এটি নতুন করে নিজেকে বিন্যস্ত করতে বাধ্য হয়। মহাকাশচারী লুকা পারমিতানো জানিয়েছেন, মহাকাশে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর পর তিনি নিজেই নিজের শরীরের পরিবর্তন অনুভব করতে পেরেছেন। তার মতে, শরীর নিজেকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এক ধরনের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

আগে মনে করা হতো, প্রতিদিনের ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশি ও হাড়ের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ মিশনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ওপর প্রভাবটি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহ বা চাঁদে দীর্ঘ মিশনের ক্ষেত্রে মহাকাশচারীদের বারবার অভিকর্ষ ও শূন্য অভিকর্ষের মধ্যে আসা-যাওয়ার প্রয়োজন হবে। আট মাস বা তার বেশি সময় শূন্য অভিকর্ষে কাটিয়ে মঙ্গল গ্রহে নামার পর সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মহাকাশচারীদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের সামঞ্জস্য বিধান বা রিক্যালিব্রেশন কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত ফ্লাইট সার্জন আলেসান্দ্রো আলসিবিয়াদের মতে, মহাকাশে কার্যকর মস্তিষ্ক ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়। যদিও বর্তমানে মহাকাশচারীরা পৃথিবীতে ফেরার পর পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন, তবে ভবিষ্যতের আন্তঃগ্রহ অভিযানে এই বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। মহাকাশচারীরা যখন পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকবেন, তখন তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাই মহাকাশ মিশনের ঝুঁকি কমাতে মস্তিষ্কের এই অভিযোজন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।

banner
Link copied!