যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস এবং নিউইয়র্কের বিভিন্ন আধুনিক রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতে স্বয়ংক্রিয় রোবট এখন মানুষের তৈরি পানীয় পরিবেশনের পাশাপাশি বকশিশ বা টিপস দাবি করছে। বিবিসি নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের তথ্যমতে, এই ঘটনা গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং এই বাড়তি অর্থ প্রকৃত শ্রমিকদের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
লাস ভেগাসের ভেনিশিয়ান হোটেলের ভেতরে অবস্থিত `দ্য টিপসি রোবট` নামের একটি বারে স্বয়ংক্রিয় দুটি রোবটিক হাত পানীয় তৈরি করে। সেখানে একটি মার্গারিটার দাম নেওয়া হয় ১৭ ডলার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অর্থ পরিশোধের সময় ডিজিটাল পর্দায় অতিরিক্ত ১০ শতাংশ `সার্ভিস ফি` বা বকশিশ চাওয়া হয়। একইভাবে, নিউইয়র্কের `আর্টলি কফি` নামের একটি ক্যাফেতেও রোবট বারিস্তা গ্রাহকদের কাছে বকশিশ দাবি করেছে। এমনকি নেওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি কর্মীবিহীন কিয়স্কে পানির বোতল কেনার সময়ও স্বয়ংক্রিয় চেকআউট মেশিন বকশিশের প্রস্তাব দেয়।
এই প্রবণতা শ্রম আইন ও ন্যায্য মজুরি নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং `গ্র্যাচুইটি` বইয়ের সহ-লেখক হলোনা ওক্স বিবিসি নিউজকে জানান, রোবটকে দেওয়া বকশিশের মালিকানা কার হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো কোনো আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা রোবটের পাওয়া বকশিশ নিজেদের পকেটে পুরছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বকশিশ সংস্কৃতির পেছনে একটি বড় অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। দেশটিতে সাধারণ কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭.২৫ ডলার হলেও, যেসব কর্মী বকশিশ পান তাদের মূল মজুরি মাত্র ২.১৩ ডলারে নামিয়ে আনা যায়। আইন অনুযায়ী, মানুষের পাওয়া বকশিশের ভাগ মালিকরা নিতে পারেন না। কিন্তু রোবটকে দেওয়া বকশিশের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য কি না, তা একেবারেই অস্পষ্ট। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এই ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বাড়তি মুনাফা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবশ্য সব প্রতিষ্ঠান এই অভিযোগ মানতে নারাজ। আর্টলি কফি এবং দ্য টিপসি রোবটের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, তাদের মেশিনে জমা হওয়া বকশিশের পুরোটাই পেছনের সারিতে কাজ করা মানবকর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। আর্টলি কফি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রাহকদের অসংখ্য অভিযোগের পর তারা ইতোমধ্যে বকশিশ চাওয়ার অপশনটি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, তারা মানবকর্মীদের বাদ দিয়ে শুধু খরচ বাঁচানোর জন্য রোবট আনেনি; বরং কর্মী সংকটের সময়ে এটি একটি সহায়ক প্রযুক্তি মাত্র।
তবে গ্রাহক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন `ওয়ান ফেয়ার ওয়েজ` বলছে, রোবট ব্যবহার করে মূলত কম মজুরি দেওয়ার সংস্কৃতিকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। রেস্তোরাঁ খাতে কর্মী সংকটের মূল কারণ হলো ন্যায্য পারিশ্রমিক না দেওয়া।
করোনা মহামারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিটি কেনাকাটায় ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমগুলো বকশিশ চাইছে। অনেকেই একে `আবেগিক ব্ল্যাকমেইল` বলে আখ্যায়িত করেছেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল লিনের মতে, মানুষ সাধারণত ভালো সেবার পুরস্কার বা কম মজুরি পাওয়া কর্মীদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই বকশিশ দেয়। কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই প্রযোজ্য নয়। তিনি মনে করেন, গ্রাহকদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে অচিরেই এই রোবট বকশিশ প্রথা বাজার থেকে হারিয়ে যাবে।
মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটেরিনা বেরেজিনা পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ রোবট বারিস্তাকে বকশিশ দিতে ইচ্ছুক। তবে যদি গ্রাহকদের নিশ্চিত করা হয় যে এই অর্থ মানবকর্মীরাই পাবেন, তখন প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ বকশিশ দিতে রাজি হন। বেরেজিনা মনে করেন, এই শিল্পকে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। অনেক সময় রোবটের রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক খরচ মেটাতেই এই সার্ভিস ফি নেওয়া হয়।
মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজের একটি বড় অংশ বকশিশ না দিলে অপরাধবোধে ভোগে। ডিজিটাল স্ক্রিন যখন সবার সামনে বকশিশের হার দেখায়, তখন সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দেন। কিন্তু একটি অনুভূতিহীন যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এই সামাজিক চাপ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা বর্তমানে প্রশ্ন তুলেছেন।
