বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩

মাটির গভীরে ডেটা সেন্টার, বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৯, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

মাটির গভীরে ডেটা সেন্টার, বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন

ড্রোন হামলা, যুদ্ধ এবং বিভিন্ন ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক হুমকি থেকে বাঁচতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টার মাটির নিচে বা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সরিয়ে নিচ্ছে। বিবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিশাল টানেল বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাটির গভীরে এই অতি জরুরি স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভূপৃষ্ঠের ওপর থাকা স্থাপনাগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি বেগবান হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি খনিতে সম্প্রতি ‘আর্থগ্রিড’ নামের একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তির টানেল বোরিং মেশিন পরীক্ষা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ট্রয় হেলমিং জানিয়েছেন, তাদের মেশিনটি ২৭,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অতি-উত্তপ্ত প্লাজমা ব্যবহার করে শক্ত গ্রানাইট পাথর পর্যন্ত গলিয়ে ফেলতে সক্ষম। এই তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও অনেক বেশি। গত জানুয়ারি মাসে চালানো এক পরীক্ষায় মেশিনটি তিন মিটার পাথর কেটে সফলভাবে একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। এই বিপুল তাপমাত্রায় পাথর গলে লাভার মতো বেরিয়ে আসে, যা একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুড়ঙ্গ থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে বিমানবন্দর ও গুদামগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে রাস্তার ওপর ট্রাকের চাপ কমানো যায়।

মাটির নিচে অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় কারণ। জোসেফ গ্যালাঘার নামের একটি পুরকৌশল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রবি ম্যাকগোরান বিবিসি নিউজকে জানান, ইউক্রেনে ড্রোন হামলার পর ভূপৃষ্ঠের স্থাপনাগুলো কতটা অরক্ষিত, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে বিশেষ করে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলো এখন তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ, ফাইবার অপটিক কেবল এবং অন্যান্য জরুরি অবকাঠামো ভূগর্ভস্থ করার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে। লেজার-গাইডেন্স ব্যবস্থা এবং গাইরোস্কোপের মতো প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ আগের চেয়ে অনেক নিখুঁত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আলেকজান্ডার আর ই টেইলর একে ‘ডেটা বাঙ্কার বুম’ বা ডেটা সেন্টারের ভূগর্ভস্থ বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের শুরুতে ইতালির ডলোমাইট পর্বতমালার ১০০ মিটার গভীরে প্রাকৃতিক গুহায় একটি নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে ট্রেন্টিনো ডেটামাইন। প্রাকৃতিকভাবে শীতল এই পরিবেশে সার্ভার ঠান্ডা রাখার খরচ অনেক কম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ডেনিস বন জানান, ৯ কোটি ঘনমিটার আয়তনের এই পাথুরে পাহাড় যেকোনো ভৌত হামলা, সাইবার অনুপ্রবেশ এমনকি ভূমিকম্প থেকেও ডেটা সেন্টারকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়। এর আগে এই জায়গাটি ওয়াইন, আপেল ও পনির সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতো।

একইভাবে সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবলগুলোও এখন আরও গভীরে পোঁতা হচ্ছে। টেলিজিওগ্রাফির বিশ্লেষক লেন বার্ডেট জানান, সমুদ্রের তলদেশে তিন মিটার পর্যন্ত গভীরে ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হচ্ছে যাতে জাহাজের নোঙর থেকে এগুলো সুরক্ষিত থাকে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় আল-কায়েদার ব্যবহৃত সুড়ঙ্গগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যা তৈরি করেছিল। এছাড়া ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর দুর্ভেদ্যতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

লন্ডনের বুকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে ১৮ মাইল দীর্ঘ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরুপ-এর কর্মকর্তা মার্ক নেলার জানান, বড় বড় শহরে এমন সুড়ঙ্গ খুবই কার্যকর। তবে সব কিছু মাটির নিচে নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এর খরচ অনেক বেশি। ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পলিসি জার্নালের সম্পাদক রিচার্ড লিটলের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক বোমার ভয়ে যেমন বাঙ্কার তৈরি হতো, এখন সেই ধারণা আবার ফিরে এসেছে। আধুনিক বিশ্বে মাইক্রোচিপ তৈরির কারখানার মতো অতি সংবেদনশীল স্থাপনাগুলো মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে তিনি মনে করেন।

banner
Link copied!