বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সাইবার নিরাপত্তা সংকট

মেটার মিউজ কি ইন্টারনেটের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

মেটার মিউজ কি ইন্টারনেটের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার উন্মোচিত নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট মিউজ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। স্বাধীনভাবে ব্যবহারকারীর নির্দেশ পালন করতে সক্ষম এই সফটওয়্যারটি ইন্টারনেট পরিকাঠামো ও সাধারণ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে নজিরবিহীন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা। লাখ লাখ মানুষ ইতিমধ্যে এটি নিজেদের ডিভাইসে যুক্ত করেছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক রমেশ রাসকার এআই এজেন্টের এই বিস্তারকে তুলনা করেছেন নিয়ন্ত্রণহীন সড়কের সঙ্গে। তাঁর মতে, কোনো ট্রাফিক নিয়ম ও অবকাঠামো ছাড়া খেলার মাঠের ভেতর দিয়ে কোটি কোটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালিয়ে দিলে যেমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, অনিয়ন্ত্রিত এআই এজেন্টের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটছে। প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল সীমিত সময়ের সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে। মানুষের মতো ক্লান্তি বা ধৈর্যের সীমাবদ্ধতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেই। ফলে স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমে বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গবেষকদের আশঙ্কা, নতুন এই প্রযুক্তির কারণে ইন্টারনেটে টিকিট কাটা থেকে শুরু করে সাধারণ সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিযোগিতা করতে হবে রোবটের সঙ্গে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টারের পরিচালক ক্যালি শ্রোডার জানিয়েছেন, স্বয়ংক্রিয় বটের কারণে সাধারণ নাগরিকরা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বুকিং থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। কনসার্টের টিকিট, নামিদামি রেস্তোরাঁর টেবিল সংরক্ষণ কিংবা পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের সরকারি সুযোগগুলো সাধারণ মানুষ পৌঁছানোর আগেই স্বয়ংক্রিয় বটগুলো দখল করে ফেলবে। একজন ব্যক্তি ঘরে বসেই একাধিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট আটকে রাখতে পারবেন, যার কোনো প্রয়োজন হয়তো তাঁর নেই। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পাওয়া এক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে কৃত্রিম বট থেকে আসা ট্রাফিকের পরিমাণ এক বছরে ১২৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। এই বিশাল চাপ সামলানোর ক্ষমতা অনেক ওয়েবসাইটের নেই।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে।

সার্চ ইঞ্জিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত চ্যাটবটগুলো এখন সরাসরি ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, যার কারণে ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষের প্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকলেও তারা কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে না কিংবা পেইড সাবস্ক্রিপশন কেনে না। এর ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও সাবস্ক্রিপশনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তাদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। একইসঙ্গে প্রতিদিন শত শত স্বয়ংক্রিয় অনুরোধ আসার কারণে বহু প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসেবা চ্যানেলগুলো কার্যত বিকল হয়ে পড়ছে।

ব্যবহারকারীর অতি-ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে মেটা।

অ্যাপটি চালু করার পর এটি ব্যবহারকারীর গুগল ইমেইল অ্যাকাউন্ট, দৈনন্দিন ক্যালেন্ডার এবং কম্পিউটারের অভ্যন্তরীণ ফাইলের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চায়। যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক নিরাপত্তা সংস্থা অবজেক্টিভ-সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক ওয়ার্ডল অ্যাপটির কারিগরি কাঠামো বিশ্লেষণ করে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মাত্র ২০ মিনিটের অনুসন্ধানে এই অ্যাপটির ত্রুটি ধরা পড়ে, যার মাধ্যমে আক্রমণকারীরা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নথি হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য সংযুক্ত ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হতো। মেটা অবশ্য দাবি করেছে, ত্রুটি ধরা পড়ার পরপরই তারা তা সংশোধন করেছে এবং ব্যবহারকারীর সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কয়েক মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেবাটি চালু করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি উঠছে, তা হলো ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতসারে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা।

ক্যালি শ্রোডার সতর্ক করেছেন, মেটার পরিষেবার শর্তাবলিতে ব্যবহারকারীর সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষার কোনো আইনি প্রতিশ্রুতি নেই। কেনাকাটা বা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এজেন্টটি ব্যবহারকারীর আর্থিক লাভের চেয়ে মেটার ব্যবসায়িক অংশীদারদের স্বার্থ বেশি দেখছে কি না, তা সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। এছাড়া একবার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলের ভেতরে প্রশিক্ষিত হয়ে গেলে, তা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবহারকারীরা চাইলে সেটিংসে গিয়ে এই ডেটা প্রশিক্ষণ বন্ধ করতে পারেন বলে জানিয়েছে মেটা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন ইন্টারনেটে স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টদের কার্যকলাপের জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে।

banner
Link copied!