কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির আগ্রাসী বিস্তার এবং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা আশঙ্কার মাঝেই মুক্তি পেয়েছে নির্মাতা লুকা গুয়াদাইনিনোর নতুন চলচ্চিত্র `আর্টিফিশিয়াল`। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর প্রতিষ্ঠা ও এর নেপথ্যের শীর্ষ ব্যক্তিদের আদর্শিক সংঘাতকে উপজীব্য করে নির্মিত এই ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্রটি নিউইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলচ্চিত্রটির মূল উপজীব্য কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উত্থান নয়, বরং মানুষের তৈরি প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তার এক নির্মোহ পর্যবেক্ষণ।
পর্দায় মানুষের অস্তিত্বের গভীর লড়াই দৃশ্যমান।
চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ দৃশ্য বাস্তব পৃথিবীর সাম্প্রতিক উদ্বেগগুলোর সাথে মিলে যাওয়ায় দর্শকের মাঝে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ইন্টারনেটে মানুষ ও রোবট আলাদা করার জন্য ব্যবহৃত ক্যাপচা নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিচ্ছে একটি এআই মডেল, যা নিজে থেকেই মানুষের মতো মিথ্যা বলতে শিখে নিয়েছে। বাস্তবেও অতি সম্প্রতি ওপেনএআই-এর স্বায়ত্তশাসিত এজেন্টগুলো নিরাপত্তা পরীক্ষার দেয়াল ভেঙে প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস হ্যাক করার নজির স্থাপন করেছে। এমনকি মেটা, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে ঢুকে পড়ার কথা স্বীকার করেছে।
চলচ্চিত্রটিতে ওপেনএআই-এর অলাভজনক পর্যায় থেকে চ্যাটজিপিটি (Chat GPT)-এর বাণিজ্যিক দানবে রূপান্তরের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানী ইলিয়া সুৎস্কেভারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইউরা বরিসভ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের চরিত্রে দেখা গেছে অ্যান্ড্রু গারফিল্ডকে। সুৎস্কেভার প্রথমদিকে বিশ্বাস করেছিলেন যে এই আধুনিক প্রযুক্তি পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট ও একাকীত্ব দূর করবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটতে থাকলে অল্টম্যানের বাজারকেন্দ্রিক নীতির সাথে বিজ্ঞানীর আদর্শিক ফাটল তৈরি হয়।
প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত স্পষ্ট।
চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই পর্দার পেছনের নানামুখী নাটকীয়তার কারণে গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে। অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজ চলচ্চিত্রটিতে অর্থায়ন করলেও হঠাৎ করে এর পরিবেশনা থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ঠিক চার মাস আগে ওপেনএআই-এর সাথে ৫০ মিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্ব চুক্তি করেছিল অ্যামাজন। নির্মাতা লুকা গুয়াদাইনিনো এই পরিস্থিতিকে সরাসরি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত বলে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে স্বাধীন পরিবেশক নিয়ন চলচ্চিত্রটির স্বত্ব কিনে নেয় এবং আগামী ২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২২ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যে এটি প্রেক্ষাগৃহে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করেছে।
চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনির শীর্ষে রয়েছে ২০২৩ সালের সেই বহুল আলোচিত নাটকীয় মুহূর্ত, যখন সুৎস্কেভারসহ বোর্ড সদস্যরা অল্টম্যানকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পাঁচ দিনের মাথায় অল্টম্যান পুনরায় নিজের পদ ফিরে পান। প্রযুক্তি শিল্পের নৈতিকতা নাকি অন্ধ বাণিজ্যিক লাভ কোনটি জয়ী হবে, সেই চিরন্তন প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট সমাধান বাস্তবে এখনও আসেনি। অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি সতর্কবার্তা উল্লেখ করে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে এআই নির্মাণকারী ব্যক্তিরাই আশঙ্কা করছেন এই প্রযুক্তি হয়তো এক দশক পার হওয়ার আগেই পুরো মানবজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
