২০২৬ সালের গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে এখন সাজসাজ রব। প্রতি বছরই এই সময়টা পর্যটন খাতের জন্য সবচেয়ে বড় মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এবারের দৃশ্যপট বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশ আলাদা। ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের ওপর ছায়া ফেলেছে মূলত দুটি বড় বিষয়—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় আয়োজিতব্য ফিফা বিশ্বকাপ এবং বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা। এই পরিস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ পরিবারকে তাদের শখের ভ্রমণের জন্য বাজেট ও পরিকল্পনায় বড় ধরনের রদবদল করতে হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের মানুষের ভ্রমণের ধরন ভিন্ন হয়। কেউ হয়তো সাশ্রয়ী ক্যাম্পিং বেছে নিচ্ছেন, কেউবা পূর্বপুরুষের জন্মভিটায় ফিরে যাচ্ছেন। তবে একটি বিষয় সবার জন্য সাধারণ—স্মৃতি তৈরির প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই বছর বিশেষ করে আমেরিকা অঞ্চলের পর্যটকদের জন্য চ্যালেঞ্জটা বেশি। যেহেতু উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপের বড় বড় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, তাই অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের দাম ও হোটেল ভাড়া সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক মার্কিন পরিবার তাই দেশের ভিড় এড়িয়ে ইউরোপ বা এশিয়ার দিকে পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা করছেন।
এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো টেক্সাসের সুগার ল্যান্ডের বাসিন্দা কলাম্বো পরিবার। জশ কলাম্বো এবং তার স্ত্রী ব্ল্যাঙ্কা মোলনার তাদের তিন বছরের কন্যা অলিভিয়াকে নিয়ে এবার সাত সপ্তাহের জন্য ইউরোপ ও তুরস্ক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। সাধারণত সাত সপ্তাহের ইউরোপ ভ্রমণের কথা শুনলে যে বিশাল বাজেটের চিন্তা মাথায় আসে, এই পরিবারটি সেখানে বেশ হিসেবি। তারা ছয় হাজার ডলারের একটি নির্দিষ্ট বাজেট নির্ধারণ করেছেন। এই বাজেটের বড় একটি অংশ অর্থাৎ মাথাপিছু ১,২০০ ডলার ব্যয় হচ্ছে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার বিমানে টিকিট কাটতেই। সাশ্রয়ের জন্য তারা বেছে নিয়েছেন `স্লো ট্রাভেল` পদ্ধতি, যেখানে তারা বন্ধুর বাড়িতে বা পারিবারিক আবাসস্থলে অবস্থান করবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালে পর্যটকদের মধ্যে `ভ্যালু সিকিং` বা সাশ্রয়ী বিকল্প খোঁজার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। টেক্সাসের এই পরিবারটির মতো অনেকেই এখন আর বিলাসবহুল রিসোর্টে না গিয়ে নিজেদের আত্মীয় বা বন্ধুদের বাসায় থাকার কৌশল নিচ্ছেন। ব্ল্যাঙ্কা মোলনার যেমনটা জানালেন, তারা তুরস্কে তার এক বন্ধুর হলিডে হোমে থাকবেন এবং সুপারমার্কেট থেকে খাবার কিনে নিজেরাই রান্না করবেন। এতে রেস্তোরাঁর বিশাল খরচ বেঁচে যাবে। এই ধরনের `হোম-টু-হোম` ট্রাভেল এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ভ্রমণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভ্রমণের দৈর্ঘ্য এবং গন্তব্য নির্বাচনে এবার মুদ্রা বিনিময় হারের প্রভাবও লক্ষণীয়। ডলারের বিপরীতে অনেক দেশের মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আমেরিকানদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট দেশ এখন অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে যারা ইউরোপ থেকে আমেরিকায় আসতে চাচ্ছেন, তাদের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের শহরগুলোতে আবাসনের ভাড়া এখন আকাশচুম্বী। এই চাপ এড়াতে অনেক পরিবার জুন-জুলাইয়ের মূল পিক সিজন বাদ দিয়ে আগস্টের শেষের দিকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। একে পর্যটন ভাষায় বলা হয় `শোল্ডার সিজন` ট্রাভেল।
সংস্কৃতিভেদে ছুটির দিনের পার্থক্যেও পরিকল্পনায় ভিন্নতা আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে বছরে মাত্র ১১ থেকে ১৫ দিন পেইড লিভ পাওয়া যায়, সেখানে মেক্সিকো বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে ছুটির দৈর্ঘ্য অনেক বেশি থাকে। ফলে ব্ল্যাঙ্কা মোলনারের মতো যারা ফ্রিল্যান্সিং বা নিজস্ব পেশায় আছেন, তারা দীর্ঘ মেয়াদী ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু জশ কলাম্বোর মতো যাদের নির্ধারিত চাকরি আছে, তাদের মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য পরিবারের সাথে যোগ দিতে হচ্ছে। এই ধরনের `স্প্লিট ট্রাভেল` বা পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে যোগ দেওয়ার পদ্ধতিও এবার জনপ্রিয় হচ্ছে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আউটডোর অ্যাক্টিভিটি বা বহির্মুখী কার্যক্রমের প্রতি ঝোঁক। কেবল সমুদ্র সৈকতে শুয়ে থাকা নয়, বরং হাইকিং, ঐতিহাসিক দুর্গ পরিদর্শন বা থার্মাল বাথে সময় কাটানোর মতো সক্রিয় ভ্রমণকে মানুষ প্রাধান্য দিচ্ছে। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের দুর্গ বা তুরস্কের আন্টালিয়ার সৈকতে সময় কাটানোর যে পরিকল্পনা ব্ল্যাঙ্কা মোলনার করেছেন, তা আসলে এই সক্রিয় ভ্রমণেরই একটি প্রতিফলন। ছোট শিশু বা টডলার আছে এমন পরিবারের জন্য এই ধরনের পরিকল্পনা অনেক বেশি কার্যকর।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ কেবল একটি ছুটি নয়, বরং এটি পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার এক বড় পরীক্ষা। যারা আগেভাগে পরিকল্পনা করেছেন এবং বিকল্প উপায়ে খরচ কমানোর পথ খুঁজেছেন, তারাই এবারের ছুটিটা উপভোগ করতে পারবেন। জ্বালানির দাম বা বিশ্বকাপের উন্মাদনা যাই থাকুক না কেন, পরিবারের সাথে কাটানো সময়টুকু মানুষের কাছে অমূল্য। তাই পর্যটকরা এখন ব্যয়ের চেয়েও অভিজ্ঞতার মানের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। সীমিত বাজেটেও যে বিশাল আনন্দ পাওয়া সম্ভব, তা এই বছরের ভ্রমণ প্রবণতাই প্রমাণ করছে।
