থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি জনপ্রিয় লাইভ মিউজিক বারে গত রবিবার রাতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ নিশ্চিত করেছে, বিবিসি নিউজ এবং এপি নিউজ জানিয়েছে। চাতুচাক জেলায় অবস্থিত `রং বিয়ার না লাত ফরাও` নামের ওই পানশালায় মধ্যরাতের ঠিক কিছু আগে আগুন লাগার এই ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পর জরুরি বহির্গমন পথগুলো তালাবদ্ধ থাকা এবং ভেতরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চিহ্নের অভাবের কারণে এই বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। থাই প্রশাসন এখন এই ঘটনার পেছনে মালিকপক্ষের চরম অবহেলা ও উদাসীনতা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৩০ জন প্রাণ হারানোর পাশাপাশি আরও ৭০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অন্তত ২৪ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভবনের সিলিংয়ে থাকা একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হওয়ার মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন লাগার সাথে সাথেই পুরো বারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকার হয়ে যায় এবং ভেতরে থাকা মানুষজন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে।
থাইল্যান্ডের প্রকৌশল ইনস্টিটিউটের অগ্নি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুসাকর্ন সায়েনসুক দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন যে বারের পেছনের টয়লেটের কাছের জরুরি দরজাটি সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া সামনের প্রধান প্রবেশদ্বারের দুটি দরজাও আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আগুন থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভেতরের পেছনের দিকে ছুটে গিয়েছিল, যার ফলে অধিকাংশ মরদেহ টয়লেট ও পেছনের অবরুদ্ধ দরজার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। যদি জরুরি প্রস্থানের পথগুলো সচল ও আলোকিত থাকত, তবে মানুষ সহজেই তা খুলে বেরিয়ে আসতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, বারের ভেতরে ডেকোরেশনের জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত দাহ্য পদার্থগুলো কেন আগে প্রশাসনের নজরে আসেনি। বারের মঞ্চটি প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সাজানো ছিল এবং পুরো সিলিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল এক ধরনের দাহ্য ফোম। আগুন লাগার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো মঞ্চ এবং সিলিংয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ঘটনার সময় মঞ্চে পারফর্ম করা স্থানীয় একটি ব্যান্ডের দুজন সদস্যও এইদর্শনে প্রাণ হারিয়েছেন। কাঠামো প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওরসাক কানোক নুকুলচাই জানান, দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এসে আগুন দ্রুত কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে, যা মানুষ পুড়ে মরার আগেই তাদের শ্বাসরোধ করে ফেলে।
তদন্তে আরও একটি আইনি ফাঁকফোকর সামনে এসেছে যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ করেছে। ব্যাংকক নগর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি বিনোদন কেন্দ্রের পরিবর্তে `লাইভ মিউজিকসহ রেস্তোরাঁ` হিসেবে নিবন্ধিত ছিল। এই বিশেষ ক্যাটাগরির কারণে ভবনটিতে আগুন প্রতিরোধী উপাদান ব্যবহার করার কোনো আইনি বাধ্যবাকতা ছিল না। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিথিপুন্ট মঙ্গলবার জানিয়েছেন যে তারা এখন রেস্তোরাঁ ও বিনোদন কেন্দ্র উভয় ক্ষেত্রেই এই ধরনের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের নিয়মকানুন কঠোরভাবে পর্যালোচনা করছেন। পুলিশ প্রধান জেনারেল কিত্তিরাত ফানপেত স্পষ্ট জানিয়েছেন যে এই ঘটনায় অবহেলাকেই প্রধান অপরাধ হিসেবে ধরে তাদের তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পূর্বে এই বারের মালিকের আরেকটি পানশালা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডের ইয়াসোথন প্রদেশে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল বলে স্থানীয় পিবিএস থাই সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সে সময় দিনের বেলা দুর্ঘটনা ঘটায় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও এবার রাতের অন্ধকারে প্রায় ৩০০ জন গ্রাহকের উপস্থিতিতে এই ট্র্যাজেডি ঘটল। নিহতদের মধ্যে ইতিমধ্যে ২৭ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকিদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে বারের বাইরে ফুল দিয়ে স্বজনদের কান্নায় ব্যাংককের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। থাই প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো ব্যাংকক শহরের এই জাতীয় বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে একটি বিশেষ অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
