চীনের অধিকাংশ বড় শহর ধীরে ধীরে মাটির নিচে বসে যাচ্ছে বলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রায় অর্ধেক নগর এলাকা অস্বাভাবিক হারে নিচু হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বড় ধরনের বন্যার হুমকির মুখে পড়তে পারে। চীনের মতো জনবহুল দেশে এই ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন কয়েক কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গবেষক দলটির তথ্য অনুযায়ী, চীনের বিরাশিটি বড় শহর নিয়ে এই সমীক্ষাটি চালানো হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ নগর এলাকা প্রতি বছর তিন মিলিমিটারের চেয়েও বেশি হারে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়, অন্তত ১৬ শতাংশ এলাকা প্রতি বছর দশ মিলিমিটারেরও বেশি হারে বসে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মূলত দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলের শহরগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা চীনের আধুনিকায়নের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
শহরগুলোর মাটি বসে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক উত্তোলন। শহরের বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় মাটির নিচের স্তরে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা এবং বিশাল অবকাঠামোর অতিরিক্ত ওজনের কারণেও মাটি দেবে যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন এবং উঁচু ভবনগুলো যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে এই সমস্যা বেশি প্রকট।
চীনের উপকূলীয় শহরগুলো এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, যদি বর্তমান হারে মাটির নিচে বসে যাওয়ার প্রবণতা চলতে থাকে, তবে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে উপকূলীয় এলাকার একটি বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের বিভিন্ন শহর ইতিমধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। নগর পরিকল্পনায় ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। চীনের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে নগরায়নের সাথে সাথে পরিবেশগত এই হুমকিগুলো এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণাপত্রটির লেখকবৃন্দ জাতীয় পর্যায়ে এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কোটি কোটি নাগরিককে এই সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যায়।
