শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইরাক ও মার্কিন চুক্তি: ওয়াশিংটনে ৪৮টি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

ইরাক ও মার্কিন চুক্তি: ওয়াশিংটনে ৪৮টি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফরকালে দেশটির সরকারি ও বেসরকারি খাতের সাথে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মোট ৪৮টি অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর গণমাধ্যম কার্যালয় নিশ্চিত করেছে, রয়টার্স ও এএফপি জানিয়েছে। এই প্রাথমিক চুক্তিগুলো গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন চেম্বার অব কমার্সে আয়োজিত এক দ্বিপাক্ষিক বিজনেস সামিটে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। ইরাক ও মার্কিন চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাগদাদ মূলত দেশের তেল ও বিদ্যুৎ খাতের দ্রুত আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে নতুন বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করতে চায়। এই বড় অর্থনৈতিক পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বিবেচিত হচ্ছে।

এই ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বের অধীনে ইরাক ও সিরিয়া যৌথভাবে একটি দীর্ঘকাল ধরে সম্পূর্ণ অচল থাকা অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইন পুনর্নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই কৌশলগত পাইপলাইনটি উত্তর ইরাকের তেলসমৃদ্ধ কিরকুক অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াসে গিয়ে শেষ হয়েছে। ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন এই বিশাল প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক কাজগুলো campoপর্যায়ে সম্পন্ন করবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই যৌথ পরিকল্পনাকে জোরালোভাবে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম এই প্রকল্পের সমস্ত কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো সরাসরি তদারকি ও সম্পাদন করবে।

আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে এই ঐতিহাসিক পাইপলাইনটি পুরোপুরি পুনর্গঠিত হলে প্রতিদিন প্রাথমিক অবস্থায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে পরিবহন করা সম্ভব হবে। তারা এই প্রকল্পটিকে ইরাকি তেল উৎপাদনকে ভূমধ্যসাগরীয় রপ্তানি বাজার এবং তার বাইরের দেশগুলোর সাথে সংযুক্ত করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি করিডোর হিসেবে বর্ণনা করেছে। বাগদাদ প্রশাসন মূলত হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতেই এই বিকল্প পথটি বেছে নিয়েছে। বর্তমানে ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই মেগা প্রকল্পে শেভরন ছাড়াও আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও প্রকৌশল কোম্পানি সরাসরি যুক্ত হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক্সনমোবিল, কেবিআর, জিই ভারনোভা, ও হ্যালিবার্টনের মতো বিশ্বখ্যাত ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে যারা ইরাকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে কাজ করবে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতে আধিপত্য বিস্তারকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সাথেও ইরাক সরকার একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যার মূল উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আধুনিক উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা সফলভাবে চালু করা। ইরাকি অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের মতে এই চুক্তিগুলো দেশের দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর অবকাঠামো পুনর্গঠনে অত্যন্ত বড় অর্থনৈতিক অবদান রাখবে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই চুক্তিগুলোর মাঠপর্যায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঠিক কত দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং সিরিয়ার বর্তমান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে এই দীর্ঘ পাইপলাইনের সামগ্রিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। তবে ইরাক ও মার্কিন চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এই মেগা প্রকল্পের সফলতার ওপর ইরাকের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করছে যা দেশটিকে একটি নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

banner
Link copied!