ফিলিপাইনের ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের সম্মেলন কক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বৃহস্পতিবার এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই কূটনৈতিক মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ আলোচনার প্রধান বিষয় থাকলেও নেপথ্যে প্রাধান্য পায় মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন বিতর্ক। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর গোপন ঘাঁটিতে ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়া প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে কিনা তা নিয়ে গভীর অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন উঠেছে যে পেন্টাগন ও মার্কিন গোয়েন্দারা এখন মস্কোর সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই সিআইএ কেন্দ্রে হামলার খবর প্রথম প্রকাশ পায়। ২০২৬ সালের তিন মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায় যে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা সিআইএ স্টেশনে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এর পরপরই ছয় মার্চ সিএনএন মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে জানায় যে উপসাগরে মার্কিন সামরিক কর্মী এবং বিমানের অবস্থান চিহ্নিত করতে তেহরানকে সহায়তা করছে মস্কো। সম্প্রতি রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয় যে সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলার পর মার্কিন গোয়েন্দারা রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা উপগ্রহের ভূমিকা তদন্ত করতে শুরু করেছেন।
হামলাগুলোর অস্বাভাবিক নির্ভুলতা দেখে সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে কেবল ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে এত নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন যে রাশিয়ার সামরিক সহায়তার বিষয়টি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি সম্ভাবনা। ইরান নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নতি করলেও তাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক সামরিক উপগ্রহ নেই যা রিয়েল-টাইমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর তথ্য প্রদান করতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়ার উন্নত মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে যা তারা কৌশলগত চুক্তির আওতায় তেহরানের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের বাইরেও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নিজস্ব মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। এই নেটওয়ার্ক প্রায়শই পশ্চিমা বিশ্লেষকদের চোখ এড়িয়ে যায় যার ফলে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনে ইরান স্থানীয় তথ্যের ওপরও অনেকটা নির্ভর করে। তবে সৌদি আরবের সুরক্ষিত স্থানে সিআইএ স্টেশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতা রাশিয়া ছাড়া পাওয়া কঠিন। ফলে তেহরান ও মস্কোর মধ্যে একটি গোপন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চুক্তি কার্যকর রয়েছে বলে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষকরা জোরালো সন্দেহ করছেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি রাশিয়ার এই সরাসরি অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খুঁজে পায় তবে ওয়াশিংটন মস্কোর বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সুগভীর সামরিক অংশীদারিত্ব এখন আর কেবল ড্রোন সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই বরং উচ্চমানের কৌশলগত তথ্য বিনিময়ে পৌঁছেছে। ম্যানিলায় দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বিতর্কের কথা সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। এই জটিলতা দূর প্রাচ্য থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত প্রতিটি কূটনৈতিক আলোচনায় বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে।
