জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপের কুমামোতো অঞ্চলে মঙ্গলবার বিকেলে সাত দশমিক এক মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে বলে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সময় বিকেল চারটা সাতাশ মিনিটে আঘাত হানার পর এই তীব্র ভূকম্পনের ফলে বেশ কিছু প্রাচীন ও আধুনিক ভবন ধসে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জাপান আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে যে উৎপত্তিস্থলে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ সাত মাত্রায় পৌঁছেছিল এবং এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার গভীরে, যার ফলে কম্পনের তীব্রতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে কুমামোতো অঞ্চলের একটি বড় শপিংমলের দ্বিতীয় তলা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে এবং এর ভেতর বহু সাধারণ মানুষ ও ক্রেতা আটকা পড়ে আছেন বলে স্থানীয় দমকল বাহিনী ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। এই অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি জরুরি এক সরকারি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে সরকার মানবজীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে তিন হাজার ছয়শ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে উদ্ধারকর্মীরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া ভাষণে জানানো হয়েছে যে কুমামোতো ও এর আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কিছু মহাসড়কের ওভারপাস ও ফুটব্রিজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভূমিকম্পের পরপরই ওই অঞ্চলের প্রায় আটচল্লিশ হাজার তিনশ পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে এবং ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকর্মীরা বিভিন্ন স্থান থেকে আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ট্রেন চলাচল ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর সম্ভাব্য সুনামি আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক সতর্কতা জারি করা হলেও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর তা দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে জাপান আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে আগামী কয়েক দিন ধরে শক্তিশালী আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন অনুভূত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকার এবং যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে দেশটির প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে এবং সেখানে কোনো ধরনের বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দিনরাত নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্ত জরুরি সেবা সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও জাপানের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনায় গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে উদ্ধার কাজের মূল লক্ষ্য হলো ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া প্রতিটি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা। আবহাওয়া পরিস্থিতি ও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই জরুরি অবস্থা বলবৎ থাকবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
