বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩

সিরিয়ার সাবেক শাসক আসাদের চাচাতো ভাই ওয়াসিম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

সিরিয়ার সাবেক শাসক আসাদের চাচাতো ভাই ওয়াসিম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত

সিঁড়ির নিচে বা অন্য কোথাও নয়, একেবারে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনেছেন সিরিয়ার সাবেক শাসক বাশার আল আসাদের চাচাতো ভাই ওয়াসিম আল আসাদ। দেশটির দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, পরিকল্পিত হত্যা এবং নির্যাতনের অভিযোগে তাকে এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আল জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি ও সানার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দামেস্কের চতুর্থ ক্রিমিনাল আদালত এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আসাদ পরিবারের কোনো সদস্যের উপস্থিতিতে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘটল।

আদালতের প্রধান বিচারক ফখরুদ্দিন আল আরিয়ান শুনানির সময় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন যে ওয়াসিম আল আসাদের সরাসরি নির্দেশে ও নেতৃত্বে গঠিত মিলিশিয়া বাহিনী বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় অত্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। বিশেষ করে দামেস্কের পূর্ব ঘুটা অঞ্চলের মেলিহা শহরে চালানো সামরিক অভিযানে বহু বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে। বিচারিক কার্যক্রমে এটি সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে তার বাহিনী সাধারণ মানুষকে অপহরণ, অমানবিক নির্যাতন এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ এই অভিযোগগুলোকে সন্দেহাতীতভাবে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করেছে।

গত বছরের জুন মাসের একুশ তারিখে লেবানন সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে সিরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন ওয়াসিম আল আসাদ। সাবেক শাসক বাশার আল আসাদের পতনের পর গঠিত নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে কঠোর আইনি কাঠামোর আওতায় আনে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই শেষে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। একই সাথে তার সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত, যা দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ভূমিকা রাখবে।

এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, তার ভাই মাহের আল আসাদ এবং অপর এক আত্মীয় আতিফ নাজিবকেও আদালত অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে আসাদ পরিবারের কোনো সদস্যের উপস্থিতিতে সরাসরি সাজার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াসিম আল আসাদের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় সিরিয়ার বিচারব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং অতীত সরকারের আমলে সংঘটিত নৃশংসতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাপ্ত করার যে অঙ্গীকার করেছে, এই রায় তারই বাস্তব প্রতিফলন।

সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করতে বর্তমান প্রশাসন বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ার এই বিচার প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছে এবং এটিকে অপরাধীদের দায়মুক্তি থেকে রক্ষা করার একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে অভিহিত করেছে। যুদ্ধাপরাধের শিকার হওয়া অগণিত পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিল। আদালতের রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা। সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার বিভাগের এই স্বাধীন ভূমিকা দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!