অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরের দক্ষিণে অবস্থিত কাবাতিয়া এলাকায় সামরিক অভিযানের সময় ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের কপালে নম্বর লিখে দিয়েছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। সোমবারের এই অভিযানের পর ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমগুলো এই অমানবিক ঘটনার খবর প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে।
ফিলিস্তিনি ওয়াফা বার্তা সংস্থার তথ্যমতে, ইসরায়েলি বাহিনী কাবাতিয়ার বেশ কয়েকটি পাড়ায় মোতায়েন ছিল। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, সেনারা বাড়িঘরে তল্লাশি চালিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে বেশ কয়েকজন যুবককে আটক করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, তারা এই অভিযানের সময় সন্ত্রাসী পরিকল্পনার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সোমবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ফিলিস্তিনি ব্যক্তির কপালে ৪৪ নম্বর লেখা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
কপালে নম্বর লেখা ওই বন্দির নাম আহমাদ আল-হাথনাউয়ি। তিনি ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এর আগে চারবার ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও এবারই প্রথম তার কপালে এভাবে নম্বর লেখা হয়েছে। ১০ দিন আগে মুক্তি পাওয়া এই ফিলিস্তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের নামে পরিবার ও মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়ানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যে বাড়িতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, সেখানে চোখ বাঁধা নারীসহ প্রায় ৫০ জন বন্দি ছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের কপালে বা শরীরে নম্বর লেখার এই চর্চা নতুন নয়। গত এপ্রিল মাসে জেনিনে ফিলিস্তিনি নারীদের হাতে নম্বর লেখার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এটিকে ভুল বিচার বলে আখ্যায়িত করেছিল।
মঙ্গলবারের বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা সৈন্যদের এই কাজের গাম্ভীর্য বুঝিয়েছেন।
ইসরায়েলি নেসেটের আইনপ্রণেতা আহমাদ তিবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে অমানবিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষকে তার পরিচয় থেকে মুছে ফেলে একটি নম্বরে পরিণত করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, যা ইতিহাসের অন্ধকার সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের অভিযান চরম আকার ধারণ করেছে। রামাল্লার কাছে ফিলিস্তিনিদের জমিতে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য তাঁবু খাটিয়েছে অবৈধ দখলদাররা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুসরা গ্রামে টানা ১১ দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে। কুসরার মেয়র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই অবরোধ ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের একটি নতুন কৌশল হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর খাবার আগামী দুদিনের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে এবং তাদের জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও ওষুধের প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ৪৬৭টির বেশি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা। এসব হামলায় অন্তত ৭৫টি ফিলিস্তিনি বাড়ি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং কুসরার চলমান অবরোধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার করে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে, যা স্পষ্টতই সন্ত্রাসবাদ এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
