পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আগামী ৯ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বুধবার রাজ্যের বিদায়ী প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে মুখ্যসচিবের সঙ্গে এক বৈঠকের পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন।
দ্য হিন্দু এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সকাল ১০টায় এই মেগা শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভা নবান্ন বা রাজভবনের গণ্ডি পেরিয়ে খোলা মাঠে শপথ নিতে যাচ্ছেন। সাধারণত বড় রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসভার জন্যই ব্রিগেড মাঠ পরিচিত। এটিকে সরাসরি শপথের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বিশাল এই জনসমর্থনকে সাধারণ মানুষের সামনে উদযাপনের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দিনটির একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যও রয়েছে। ৯ মে হলো ২৫শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী। শমিক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের জানান, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইচ্ছাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে শপথগ্রহণের এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাংলার সাংস্কৃতিক আইকনদের প্রতি দলের শ্রদ্ধার প্রতীক। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, এই ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভবানীপুর কেন্দ্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই নবনির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছে। তাঁর সঙ্গে সহ-পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি এবার ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে দলটি উপমুখ্যমন্ত্রী মডেল ব্যবহার করতে পারে। দলীয় সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গ থেকে দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করা হতে পারে।
শুধু শপথের স্থান নয়, রাজ্য পরিচালনার মূল কেন্দ্র নিয়েও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। দলীয় স্তরে জোরালো আলোচনা চলছে, নতুন সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে প্রতিষ্ঠিত হাওড়ার `নবান্ন` থেকে কাজ পরিচালনার পরিবর্তে পুরোনো রাজ্য সচিবালয় `মহাকরণ` (Writers` Building) থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাবে। মহাকরণ দীর্ঘকাল ধরে বাংলার ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। মহাকরণে ফিরে যাওয়ার এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার পুরোনো ঐতিহ্যে ফেরার পাশাপাশি একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী শনিবার কলকাতার ব্রিগেড ময়দান আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদী পালাবদলের সাক্ষী হতে চলেছে।
