সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালিতে কড়া নিয়ম ইরানের: বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে কড়া নিয়ম ইরানের: বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ওয়াশিংটন-তেহরান পাল্টাপাল্টি অবরোধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে এই কৌশলগত জলপথ অতিক্রম করতে হলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক জাহাজকে ইরানের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত হারে ট্রানজিট ফি বা টোল পরিশোধ করতে হবে। সোমবার ইরানের পক্ষ থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে, কারণ বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে যে, নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তেহরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ (পিজিএসএ) নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠন করেছে।

ইরানের নতুন এই কাঠামোর অধীনে জাহাজগুলোকে ‘ভেসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশন’ নামক একটি বিস্তারিত ফর্ম পূরণ করতে হবে। এই ফর্মে ৪০টিরও বেশি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজের মালিকানা, বিমার বিবরণ, কার্গোর ধরন, নাবিকদের বিস্তারিত তথ্য এবং প্রস্তাবিত রুট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য তেহরানকে জানাতে হবে। এছাড়া জাহাজের পরিচয় নম্বর এবং এর আগের নামগুলোও ইরানের কাছে প্রকাশ করতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ইরানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক হুঁশিয়ারিতে জানানো হয়েছে যে, যেসব দেশ বা জাহাজ ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে, তাদের জন্য এই প্রণালি অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট বা মালিকানাধীন জাহাজের ক্ষেত্রে এই পথ ব্যবহারের অনুমতি মিলবে না বলে জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে তেহরানের সাথে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা শুরু করেছে যাতে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত ব্যাহত না হয়। মূলত ইরান এই জলপথকে একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যা বিশ্ব বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

ওয়াশিংটন থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোকে এই টোল পরিশোধ না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে এবং এটিকে ‘নৌ-দস্যুতার আধুনিক সংস্করণ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বাহরাইনের সাথে মিলে জাতিসংঘে একটি নিন্দা প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় রাশিয়া ভেটো দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে এবং একটি শক্তিশালী ইরান গড়ে তুলতে এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এই জলপথে সৃষ্ট অচলাবস্থা বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক দেশ বিকল্প রুটের কথা ভাবলেও হরমুজ প্রণালির কোনো কার্যকর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। তেহরান মনে করছে যে, এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য করতে পারবে। তবে মার্কিন প্রশাসন অবরোধ আরও জোরদার করার হুমকি দেওয়ায় সংঘাতের ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ইরানের এই নতুন নিয়ম কেবল টোল আদায়ের জন্য নয় বরং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে তেহরানের সক্ষমতা প্রমাণের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

banner
Link copied!