ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে আল্পস পর্বতমালায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার পাঁচশত চুয়ান্ন মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ইউরোপের সর্বোচ্চ মনুষ্যনির্মিত ভবনে রাত কাটানোর জন্য পর্বতারোহীদের তীব্র বরফাবৃত খাড়া গিরিপথ পাড়ি দিতে হয়, বিবিসি নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের ভ্রমণবিষয়ক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
মন্টে রোসা পর্বতসারির পুন্তা নিফেত্তি চূড়ার ওপর খাড়া পাথরের শেষ প্রান্তে ধাতব চাদরে মোড়ানো তিনতলা এই ভবনের নাম রিফুজিয়ো কাপান্না রেজিনা মারঘেরিতা। একপাশে বরফে ঢাকা তীক্ষ্ণ ঢাল এবং অন্যপাশে প্রায় এক কিলোমিটার গভীর শূন্য গিরিখাত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি স্বাভাবিকভাবে সাধারণ কোনো বাসস্থান নয়। ১৮৯৩ সালে ইতালির তৎকালীন রানি মারঘেরিতার সম্মানে এই আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়, যিনি নিজে দুর্গম পথ বেয়ে এর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি দুঃসাহসিক পর্বতারোহীদের জন্য একটি বিরল রাত্রিকালীন আবাস।
চরম উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতা ও তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়া এই অভিযানের প্রধান অন্তরায়।
প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ হাজার অভিযাত্রী এই চূড়ায় আরোহণ করেন এবং তাদের মধ্যে মাত্র চার হাজার পর্যটক চরম ঠান্ডার মধ্যে এই ভবনে রাত কাটানোর অনুমতি পান। মধ্য জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই আশ্রয়কেন্দ্রটি কার্যকর থাকে এবং সেখানে এক রাতে সর্বোচ্চ সত্তর জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। অধিকাংশ অভিযাত্রী ইতালি প্রান্তের আলানিয়া ভালসেসিয়া গ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে বরফের চিরল ফাটল ও হিমবাহ অতিক্রম করতে বিশেষ ধাতব বুট ও নিরাপত্তা দড়ি ব্যবহার করেন। হঠাৎ উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে রক্তে অক্সিজেন কমে যাওয়া ও মাথা ঘোরার মতো মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পর্বতারোহীদের ধাপে ধাপে শরীরের খাপ খাইয়ে নিতে হয়।
আবহাওয়া খারাপ হলে আশ্রয়কেন্দ্রে হেলিকপটারের মাধ্যমে রসদ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ভবনের নিচতলায় রয়েছে গরম খাবারের ব্যবস্থা এবং ওপরের তলায় রাখা হয়েছে সারিবদ্ধ ডরমিটরি শয্যা। চরম ঝড় কিংবা বজ্রপাতের সময় পুরো ভবনটি কেঁপে ওঠে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার উঁচুতে প্রকৃতির চরম শক্তির মাঝে মানুষের উপস্থিতির অসহায়ত্বকে স্পষ্ট করে তোলে।
