মহাসাগরের গভীরে সূর্যালোক পৌঁছায় না এমন একটি অঞ্চল রয়েছে, যাকে বিজ্ঞানীরা টোয়ালাইট জোন বা মেসোপেলাজিক জোন বলে অভিহিত করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুইশ মিটার গভীরে শুরু হওয়া এই অঞ্চলে সূর্যরশ্মির দেখা খুব কমই পাওয়া যায়। এক হাজার মিটার গভীরে পৌঁছালে সূর্যের আলো পুরোপুরি হারিয়ে যায়। সেখানে একমাত্র আলোর উৎস হলো বিভিন্ন প্রাণীর নিজস্ব জৈব-আলোক বা বায়োলুমিনেসেন্স। এই অন্ধকার জোনটি আপাতদৃষ্টিতে জনশূন্য মনে হলেও, এটি পৃথিবীর অধিকাংশ সামুদ্রিক মাছের আবাসস্থল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোনার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের প্রাণীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন। সোনার সংকেতগুলো সমুদ্রের গভীর থেকে এমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল যেন সেখানে শক্ত কোনো তলদেশ রয়েছে। পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটি সমুদ্রের তলদেশ নয়, বরং প্রচুর সংখ্যক সামুদ্রিক প্রাণীর একটি স্তর যা দিনের বিভিন্ন সময়ে নিচে ও ওপরে ওঠা-নামা করে। এই রহস্যময় স্তরটি এখন ডিয়েল ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন নামে পরিচিত।
প্রতি রাতে অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন জুপ্ল্যাঙ্কটন গভীর সমুদ্র থেকে পৃষ্ঠের দিকে উঠে আসে। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক প্রাণী অভিযাত্রা হিসেবে বিবেচিত। এই বিশাল যাত্রায় প্রায় দশ বিলিয়ন টন ওজনের প্রাণীর বিচরণ ঘটে। আর্কটিক সামুদ্রিক বিজ্ঞানের শিক্ষক লরা হবস এই ঘটনাকে সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করেন, যা পৃথিবীজুড়ে রাতের পর রাত নিয়মিত ঘটে চলেছে। জুপ্ল্যাঙ্কটনগুলো মূলত খাদ্যের সন্ধানেই পৃষ্ঠের দিকে উঠে আসে, কারণ সূর্যালোক থাকায় পৃষ্ঠের স্তরেই প্রচুর ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা উদ্ভিদকণা জন্মায়।
দিনের বেলা যখন সূর্যের আলো সমুদ্রপৃষ্ঠে পড়ে, তখন জুপ্ল্যাঙ্কটনগুলো শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য গভীর অন্ধকার পানিতে ফিরে যায়। সেখানে তারা খাবার হজম করে এবং সূর্যাস্তের অপেক্ষায় থাকে। সূর্যাস্ত হলে আবার তারা পৃষ্ঠের দিকে যাত্রা শুরু করে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র অন্বেষণ বিভাগের অধ্যাপক জন কোপলি দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে এই দৃশ্য দেখেছেন। তার মতে, মানুষ সমুদ্রকে নীল গ্রহ বলে অভিহিত করলেও, প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রের অধিকাংশ অংশই চিরস্থায়ী অন্ধকারের রাজ্য।
গভীর সমুদ্রের এই প্রাণীদের খাদ্যচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। টুনা ও সোর্ডফিশের মতো বাণিজ্যিক মাছের প্রধান খাদ্য উৎস এই জুপ্ল্যাঙ্কটনগুলো। এছাড়া এই ক্ষুদ্র প্রাণীরা মহাসাগরের পুষ্টি উপাদান গভীর থেকে ওপরে এবং ওপর থেকে গভীরে পরিবহনে সহায়তা করে, যাকে বিজ্ঞানীরা বায়োমিক্সিং বলে থাকেন। এদের আকার এতটাই ক্ষুদ্র যে তারা পানির সান্দ্রতা বা ভিসকাস ওয়ার্ল্ডের ভেতর বাস করে। কোপলির ভাষায়, এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য পানি অনেকটা সিরাপের মতো ঘন অনুভূত হয়।
কোটি কোটি কোপেপড বা সামুদ্রিক পতঙ্গ এই টোয়াইলাইট জোনের বড় অংশ জুড়ে থাকে। এই ক্ষুদ্র প্রাণীরা তাদের হাত-পা নাড়িয়ে যেভাবে খাবার সংগ্রহ করে, তা মহাসাগরের মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন। মহাসাগরের এই অভিযাত্রা শুধু খাদ্যচক্রের জন্যই নয়, বরং পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর এই প্রাণীরা প্রায় ছয় গিগাটন কার্বন সমুদ্রের ওপরের স্তর থেকে গভীরে বহন করে নিয়ে যায়।
সমুদ্রের এই গভীর অঞ্চলে একবার কার্বন পৌঁছে গেলে তা দীর্ঘ শতাব্দী ধরে বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকে যায়। ফলে এটি কার্বন মজুত করার একটি প্রাকৃতিক গুদাম হিসেবে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র প্রাণীরা পৃষ্ঠ থেকে যে জৈব পদার্থ খায়, তা গভীর সমুদ্রে মলত্যাগের মাধ্যমে কার্বন হিসেবে সঞ্চিত রাখে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের এই নীরব ভূমিকা আমাদের জানাশোনার বাইরে থেকে পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখছে। মহাসাগরের গহীনে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এই অদৃশ্য অভিযাত্রা আমাদের গ্রহের জীবন্ত সিস্টেমের অন্যতম প্রধান কারিগর।
