সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

খার্গ দ্বীপে হামলায় অন্তত ২৫টি হরিণের মৃত্যু হয়েছে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৪, ২০২৬, ১১:২২ পিএম

খার্গ দ্বীপে হামলায় অন্তত ২৫টি হরিণের মৃত্যু হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী রবিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত খার্গ দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দেশের পরিবেশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, প্রেস টিভি জানিয়েছে। এই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ খার্গ দ্বীপে হামলা এর ফলে ওই দ্বীপে অন্তত ২৫টি হরিণ মারা গেছে বলে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও হরিণের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের ফলে বন্যপ্রাণীর ওপর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিবেশবিদরা এই ঘটনাকে যুদ্ধের কারণে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ইরানের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা দপ্তরের উপপরিচালক মাসুমেহ সাফায়ি এই বন্যপ্রাণী নিধনের বিষয়ে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে সর্বশেষ মাঠ পর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী দ্বীপটিতে অন্তত ২৫টি হরিণের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুধুমাত্র সাধারণ বেসামরিক এলাকার জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় সামরিক বেষ্টনীর ভেতরের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধের प्रत्यक्ष বা পরোক্ষ প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং দীর্ঘস্থায়ী বিস্ফোরণ ও তীব্র শব্দের কারণে প্রাণীরা গুরুতর শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাফায়ি আরও জানান যে বিস্ফোরণের কারণে সৃষ্ট তীব্র মানসিক চাপ ও শব্দদূষণ কেবল বন্য প্রাণীদেরই নয় বরং বন্দি অবস্থায় থাকা পাখিদেরও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ কত এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্রকে পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কত বছর সময় লাগতে পারে। রাজধানী তেহরানের লাভিজান বার্ড গার্ডেনে ভয় ও তীব্র আতঙ্কের কারণে কিছু বিরল প্রজাতির পাখি তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাঁচার দেওয়ালে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেয়ে আহত ও নিহত হয়েছে। দেশটির আলবোরজ প্রদেশের একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকেও প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণ এবং সীমিত সংখ্যার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে যা পরিবেশবিদদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে অনেক পাখি চরম ভীতি ও মানসিক চাপে পড়ে যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও মাঠ পর্যায়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

যদিও এখন পর্যন্ত বুনো ছাগল, বুনো ভেড়া বা বড় মাংসাশী প্রাণীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্য সামনে আসেনি, তবু পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন যে রিপোর্ট না থাকা মানেই ক্ষতি হয়নি এমন নয়। যুদ্ধের সময় অনেক বন্য প্রাণী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বা গুহায় আশ্রয় নেয় যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব করা তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে বিভিন্ন ধরণের উপকারী পোকামাকড়, সরীসৃপ এবং মাটির নিচে বসবাসকারী ছোট প্রাণীগুলো বিস্ফোরণের সরাসরি অভিঘাত ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁких মধ্যে থাকে। বন্যপ্রাণী একটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা যুদ্ধের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

ইরানের সিনিয়র পরিবেশ গবেষক শিভা রুস্তাই এই বিষয়ে তার বৈজ্ঞানিক মতামত প্রকাশ করে বলেছেন যে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রাণহানির চেয়েও বেশি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিস্ফোরণ ও তীব্র শব্দদূষণের কারণে বন্য প্রাণীদের শরীরে ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা চরমভাবে বেড়ে যায় যা তাদের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রোগ সংক্রমণ, প্রজননক্ষমতা হ্রাস এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক পরিবেশ গবেষণায় দেখা গেছে যে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বন্যপ্রাণীদের দীর্ঘদিনের অভিবাসন পথ, খাদ্য সংগ্রহের রুট এবং স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে চিরতরে নষ্ট করে দেয়। কিছু প্রজাতির মধ্যে আচমকা গর্ভপাতের হার বেড়ে যায় এবং অনেক প্রাণীর মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ বা গভীর বিষণ্নতার লক্ষণও দেখা দেয় যা পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। সংঘাত-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে প্রাণহানির নথিভুক্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণী জনগোষ্ঠীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং আবাসস্থল পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

banner
Link copied!