শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ম্যানগ্রোভ বনের হারানো গৌরব ফিরে আসার পথে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৫, ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

ম্যানগ্রোভ বনের হারানো গৌরব ফিরে আসার পথে

বিশ্বের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনগুলো এক অভাবনীয় পুনরুদ্ধারের ধারায় রয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের পদচারণায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এখন এই বনগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বনের ধ্বংসের হারের চেয়ে নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনগত সুরক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

ম্যানগ্রোভ বনগুলো পরিবেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই বনাঞ্চল শুধু উপকূলীয় এলাকায় প্রবল ঝড় বা সুনামি থেকে লাখ লাখ মানুষকে রক্ষা করে না, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কয়েক দশক ধরে মাছ চাষ, নগরায়ন এবং আবাসন প্রকল্পের জন্য উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক হারে ম্যানগ্রোভ নিধন করা হয়েছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়ে গিয়েছিল, যা জ্যামাইকা দ্বীপের আয়তনের সমান।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত দশকে এই ধ্বংসের ধারা উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন রক্ষায় নেওয়া কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা। ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামি এবং ২০০৮ সালের ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের পর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ বুঝতে পেরেছে যে ম্যানগ্রোভ বন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দোনেশিয়া এবং মিয়ানমারের মতো দেশগুলোতে যেখানে আগে ব্যাপক হারে গাছ কাটা হতো, সেখানে এখন নতুন করে বনাঞ্চল তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় উন্নত স্যাটেলাইট চিত্র বা ইমেজারি ব্যবহার করেছেন। ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে যে, আগের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি নতুন গাছের চারা জন্মেছে। তবে এই সুসংবাদের মধ্যেও কিছু উদ্বেগের জায়গা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু জায়গায় বনাঞ্চল বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু অন্য জায়গায় পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় ম্যানগ্রোভ বন এখনো ধ্বংসের মুখে। নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে তেলের পাইপলাইনের কারণে সৃষ্ট দূষণ ম্যানগ্রোভ বনের ব্যাপক ক্ষতি করছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ম্যানগ্রোভ বনের এই পুনরুত্থানকে কেবল একটি একক সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রকৃতির নিজস্ব পুনরুৎপাদন ক্ষমতাও কাজ করছে। যদি মানুষের সচেতনতা বজায় থাকে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবেই এই বনগুলো পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে। বন রক্ষায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নই এখন এই বনাঞ্চলগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রধান চাবিকাঠি।

banner
Link copied!