ক্যানসার এমন একটি রোগ যা প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাই পরিবারের কারো ক্যানসার ধরা পড়লে রোগীসহ স্বজনরা গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। চিকিৎসকের কাছে তখন সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নটি থাকে— রোগী আর কতদিন বাঁচবেন? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রোগনোসিস বা লাইফ এক্সপেক্টেন্সি। তবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য যতটা না সহজ, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং সংবেদনশীল।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্যমতে, কোনো চিকিৎসকই একজন ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সময়কাল একদম নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রোগনোসিস বা রোগ নির্ণয়ের ভবিষ্যৎবাণী শুধুমাত্র একটি গাণিতিক হিসাব বা পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। প্রতিটি মানুষের শরীর, রোগের ধরণ এবং চিকিৎসার প্রতি শারীরিক প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়। ফলে একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত দুজন রোগীর শারীরিক অবস্থাও সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসকরা সাধারণত তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং রোগীর শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে একটি সম্ভাব্য ধারণা দিয়ে থাকেন।
ক্যানসারের ভবিষ্যৎ বা প্রোগনোসিস নির্ধারণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখেন। এর মধ্যে প্রথমেই আসে রোগের স্টেজ বা পর্যায়। ক্যানসার শরীরের কতটা অংশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কোষগুলো কত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে—তা রোগ নির্ণয়ের মূল ভিত্তি। কিছু ক্যানসার খুবই ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়, যার প্রোগনোসিস তুলনামূলক ভালো হয়। আবার কিছু ক্যানসার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগীর বয়স, পুষ্টিগত অবস্থা, হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যকারিতাও চিকিৎসার ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে।
চিকিৎসকরা প্রায়ই পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হারের মতো পরিসংখ্যান ব্যবহার করেন। এটি কোনো ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি গড় মান। ক্যানসার রিসার্চ ইউকের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতির ফলে এখনকার পরিস্থিতি কয়েক দশক আগের চেয়ে অনেক উন্নত। নতুন নতুন ওষুধ, উন্নত রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির কারণে অনেক রোগী প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সময় এবং মানসম্মত জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট দিন বা মাস বলতে চান না, কারণ এটি রোগী ও তার পরিবারের ওপর গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
ক্যানসার নির্ণয়ের পর অনেক রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা তাদের শারীরিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকদের মূল উদ্দেশ্য থাকে রোগীকে ভয় দেখানো নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করা। তারা রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা সাজাতে এবং প্রয়োজন হলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমকারী চিকিৎসার মাধ্যমে সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে কাজ করেন। ক্যানসার রোগীর জীবনের সময়কাল শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়। অনেক রোগী চিকিৎসকদের ধারণার চেয়েও দীর্ঘদিন ভালোভাবে বেঁচে থাকেন।
সঠিক ও সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ, নিয়মিত ফলো-আপ করা এবং পুষ্টি ও শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখা ক্যানসার চিকিৎসার প্রধান শর্ত। এর পাশাপাশি মানসিকভাবে ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করলে এবং পরিবারের সমর্থন পেলে রোগী অনেক কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গেও লড়াই করতে পারেন। চিকিৎসকরা যখন রোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেন, তখন সেটি প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মাধ্যমে রোগীর শেষ দিনগুলো যেন বেদনাহীন ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করার একটি অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
