বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩

গর্ভবতী নারীদের ইটিং ডিসঅর্ডার নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৮, ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

গর্ভবতী নারীদের ইটিং ডিসঅর্ডার নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গর্ভবতী নারী এক ধরনের বিপজ্জনক মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা ইটিং ডিসঅর্ডারে ভুগছেন বলে চিকিৎসকেরা বৃহস্পতিবার লন্ডনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে গর্ভকালীন সময়ে শরীরের দ্রুত পরিবর্তন এবং ওজন বৃদ্ধির ফলে অনেক নারী নিজেদের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় এই খাদ্যাভ্যাসজনিত মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা একে একটি নীরব সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে তীব্র সামাজিক লোকলজ্জা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার প্রবণতার কারণে এই সমস্যাটি প্রায়ই সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে যায়।

আমেরিকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্লেডন নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন যে সাতাশ বছর বয়সে গর্ভবতী হওয়ার পর তার শরীরের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে তিনি তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে পড়েছিলেন। তিনি অতীতে অ্যানোরেক্সিয়া বা গুরুতর অনাহারজনিত ব্যাধিতে ভুগেছিলেন এবং গর্ভধারণের পর সেই সমস্যাটি নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করে তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন যে বিশ্বব্যাপী প্রায় নয় শতাংশ নারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ইটিং ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হন যার মধ্যে গর্ভকাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সময় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি, গর্ভধারণ এবং মেনোপজের সময়ে নারীদের শরীরে হরমোনের তীব্র ওঠানামা এবং মানসিক পরিবর্তন এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক জেমা শার্প জানিয়েছেন যে গর্ভকালীন সময়টি ইটিং ডিসঅর্ডারের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। প্রায় সত্তর শতাংশ গর্ভবতী বা সন্তান প্রসব পরবর্তী নারী নিজেদের শারীরিক অবয়ব বা ওজন নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং এদের মধ্যে বড় একটি অংশ এই ব্যাধির সমস্ত মানদণ্ড পূরণ করেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো সঠিক সময়ে রোগ সনাক্তকরণের অভাব এবং উপযুক্ত স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় এই রোগীরা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ হবেন। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নারী মনে করেন যে এই বয়সে এসে এই ধরনের আচরণ প্রকাশ করা লজ্জাজনক এবং এই আত্ম-লজ্জার কারণে তারা চিকিৎসকদের কাছে নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করেন না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে আগে গর্ভবতী নারীদের পুষ্টির অভাবজনিত কারণে প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তির হার কম থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেগান গ্যালবালি নিশ্চিত করেছেন। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে হাসপাতালগুলোতে এই ধরনের রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে যথাযথ পারিবারিক সহযোগিতা এবং চিকিৎসকদের সংবেদনশীল আচরণ এই নীরব সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক মানসিক এবং পুষ্টিগত সহায়তা পেলে এই রোগীরা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

লন্ডনের চিকিৎসকেরা প্রসূতি মায়েদের এই বিশেষ মানসিক অবস্থাকে প্রেগোরেক্সিয়া নামে অভিহিত করেছেন যা মূলত গর্ভকালীন চরম খাদ্যভীতি এবং ওজন নিয়ণ্ত্রণের অবসেসনকে নির্দেশ করে। সাইত্রিশ বছর বয়সী ইয়োগা প্রশিক্ষক কোর্টনি লুইস জানিয়েছেন যে সন্তান জন্মের ঠিক পরপরই তিনি তীব্র ইটিং ডিসঅর্ডারের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং নিজের মানসিক রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রায়ই একা গাড়ির ভেতর গিয়ে চিৎকার করতেন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত যাতে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়

banner
Link copied!