শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

ফরাসি স্কুল বিক্ষোভ

কিশোরদের গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠল ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ১১:০০ এএম

কিশোরদের গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠল ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে

স্কুলছাত্রদের বিক্ষোভ দমনের সময় ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে কিশোরদের শরীরে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো গুরুতর জখম করার মারাত্মক অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার গোষ্ঠী ও আইনজীবীরা। একই সঙ্গে নজিরবিহীন সংখ্যক শিশুকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার খবর জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এ সময় কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু শারীরিক নির্যাতন ও বর্ণবাদী গালমন্দের শিকার হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সে এটিই সবচেয়ে বড় তরুণ বিক্ষোভ আন্দোলন হিসেবে দেখা দিয়েছে। জরাজীর্ণ ভবনের সংস্কার এবং অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলির দাবিতে শিক্ষার্থীরা শত শত উচ্চবিদ্যালয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ত নুনেজ সেনেটে জানিয়েছেন, পুলিশি সহিংসতার এমন ৩৬টি অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিস্ফোরক অস্ত্রের আঘাতে চার শিশুর অঙ্গহানি এবং ছয়জনের গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনা। এর বাইরে শারীরিক আঘাত, অপমান কিংবা যৌন নিপীড়নের মতো আরও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

গত ৫ অক্টোবর লঁস শহরের একটি বিক্ষোভের বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী কার্পেন্ট্রি শিক্ষার্থী এভানের বাঁ হাতের কবজি উড়ে যায়। তার আইনজীবী বেরত্রাঁ ভাত্তে জানান, ওই কিশোরের আঘাতগুলো কোনো যুদ্ধের ময়দানের মতো ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির দাবি ছিল ছেলেটি মাটি থেকে গ্রেনেড তুলে নিয়েছিল, কিন্তু আইনজীবী তা অস্বীকার করে জানান এভান কেবল ক্লাসে যাওয়ার পথে বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছিল। এভানের ডান হাতের কয়েকটি আঙুলও হারিয়ে গেছে এবং সে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে, অন্যদিকে তার পরিবার একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে।

সাঁত-উয়ান-লোমোন শহরের একটি স্কুল বিক্ষোভের কাছাকাছি জায়গায় মুখমণ্ডলে মারাত্মক আঘাত পায় চোদ্দো বছর বয়সী আরেক কিশোর ইডেন। গ্রেনেড লঞ্চারের গুলিতে তার দুটি চোয়াল ভেঙে যায়, নিচের পাটি এবং ওপরের পাটির সব দাঁত ভেঙে যায়। তার আইনজীবী এলসা মার্সেল জানান, মাত্র দেড় মিটার দূর থেকে অস্ত্রটি দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল এবং এটি যুদ্ধাস্ত্রের সমতুল্য। ইডেনের পরিবার হত্যার চেষ্টার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে তিনজন দাঙ্গা পুলিশ কর্মকর্তার মুখোমুখি হওয়ার পর ইডেনের ওপর গ্রেনেড থেকে গুলি চালানো হয়, এবং এ ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

টুর শহরে রাবার বুলেট লঞ্চারের আঘাতে ১৬ বছর বয়সী মায়েলের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মায়েলের আইনজীবী জানান, মায়েল কোনো ধরনের সহিংস সংঘাতে জড়িত ছিল না, সে কেবল বিক্ষোভে উপস্থিত ছিল।

এই বিক্ষোভগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের গণগ্রেপ্তার নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের পর থেকে আঠারো বছরের কম বয়সী ৬ হাজার ৭৩৩ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজারের বেশি শিশুকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়েছে, ২ হাজার ১৯০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রায় ২ হাজার শিশুকে বিচারের বিকল্প হিসেবে নাগরিকত্ব কোর্সের মতো কার্যক্রমে পাঠানো হয়েছে।

ফরাসি লিগ অব হিউম্যান রাইটসের সভাপতি নাতালি তেহিও জানান, বিচারকের সামনে মামলা গড়ায়নি এমন ঘটনার অনুপাত কম থাকায় এই গ্রেপ্তারগুলোর ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন আইনি নথিগুলো প্রায়ই ফাঁকা থাকে এবং বিক্ষোভ থেকে লোকজনকে নিবৃত করতেই এই গ্রেপ্তারগুলো করা হয়। আইনজীবীরা আরও জানিয়েছেন, আটকের সময় তাদের মক্কেলরা বর্ণবাদী মন্তব্য, অপমান ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

ফ্রান্সের অ্যাসোসিয়েশন অব ক্রিমিনাল লইয়ার্সের সহ-সভাপতি রোমেন বুলে আঠারো বছরের কম বয়সীদের বিক্ষোভ থেকে বিরত রাখতে পুলিশি ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এ ছাড়া সিন্ডিকে অব অ্যাভোক্যাটস অব ফ্রান্স এবং কলেক্টিফ দ্যাকশন জুদিশিয়ারের মতো সংগঠনের আইনজীবীরা পুলিশি থানায় চড়, থাপ্পড় ও কিল-ঘুষির মতো শারীরিক হামলার পাশাপাশি বর্ণবাদী, লিঙ্গভিত্তিক ও সমকামিতাবিরোধী গালমন্দের শিকার হওয়ার বর্ণনা পেয়েছেন।

banner
Link copied!