শাহিদা ফকির কখনো ভাবেননি তার ভোট দেওয়ার অধিকার এভাবে কেড়ে নেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গের একটি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শাহিদা নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে ১৯৬২ সালের ভারতীয় জন্মসনদ এবং পারিবারিক জমির দলিল পেশ করেছিলেন। এছাড়া তার বাবা-মা উভয়ের নাম দীর্ঘদিন ধরে ভোটার তালিকায় থাকার প্রমাণও তিনি দিয়েছিলেন। অথচ গত এপ্রিল মাসে যখন চূড়ান্ত সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন সেখানে তার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শাহিদা এক একা নন। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গত বছর থেকে ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় আট দশকে এত কম সময়ে কখনো এত বিপুল সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েনি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এই সংশোধনকে মৃত ও দ্বৈত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা পরিষ্কার করার একটি বৈধ উদ্যোগ হিসেবে দাবি করেছে। তবে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবিত নাগরিকদের একটি বড় অংশও তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বাদ দেওয়ার কথা বলা হলেও মূলত মুসলিম, অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করাই এর আসল উদ্দেশ্য, যারা সাধারণত ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে ভোট দেন না।
এই ঘটনার জেরে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রধান শহরগুলোতে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। নতুন দিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভ দমনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী ব্যারিকেড ও হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করে। বিক্ষোভকারীরা বিতর্কিত এই সংশোধন প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানকারী প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। এই সপ্তাহান্তের কর্মসূচিতে পুলিশ হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
গত সোমবার বিরোধী দলগুলো রাজধানীতে বড় ধরনের মিছিল বের করে এবং এই সংশোধনকে ভোট চুরির হাতিয়ার আখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন জমা দেয়। বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন যে এই প্রক্রিয়ার ফলে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপি ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুবিধা পেয়েছে, যদিও দলটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সমালোচকদের মতে, কমিশনারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কারণে নির্বাচন কমিশন ঐতিহ্যগত সাংবিধানিক সীমানা ছাড়িয়ে এখন নাগরিকত্ব নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে, যেখানে সম্প্রতি বিজেপি ক্ষমতা দখল করার পর নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর মতে, তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলিমদের সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে যাওয়ার তিন মাস পর এবং আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পুলিশ শাহিদা ফকিরকে আটক করে এবং তাকে বাংলাদেশের একজন অবৈধ অভিবাসী বলে অভিযুক্ত করে।
গত জুলাই মাসে কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়, অথচ তিনি কখনো এই দেশে আসেননি এবং এখানে তার কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। বর্তমানে তিনি সীমান্তসংলগ্ন একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। মুঠোফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহিদা জানান যে তিনি সমস্ত নাগরিকত্বের কাগজপত্র দেখিয়েও পুলিশকে তাকে দেশ থেকে না তাড়ানোর জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলেন। তবে একজন বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা তার পরিচয় নিশ্চিত করে জানান যে তারা তার নথিপত্র পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক। তার পরিবার গত সেপ্টেম্বর মাসে এই দেশত্যাগের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট দায়ের করে, যার জবাবে ভারতীয় সরকারকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
তালিকা থেকে বাদ পড়া অন্যান্য নাগরিকরা জানিয়েছেন যে তারা নিজেদের দেশেই বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের আশি বছর বয়সি বাসিন্দা মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ সিদ্দিকীর দাদা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। অথচ তিন প্রজন্ম ধরে পরিবারের নাম ভোটার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও তার নিজের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। তাকে কোনো আটক কেন্দ্রে পাঠানো হতে পারে এবং তিনি তার স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৩ সালে, যখন মোদি প্রশাসন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে নির্বাহী বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো রোনোজয় সেন জানিয়েছেন যে নির্বাচন কমিশন একসময় একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু বর্তমানে তার সেই মর্যাদা নষ্ট হয়ে গেছে। এর পরের বছর পুনর্গঠিত কমিশন বিহারে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের আগে ৬০ লাখের বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
