কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অব্যাহত অগ্রগতির সুবাদে সাম্প্রতিক প্রান্তিকে পাঁচ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে সিঙ্গাপুর। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত সরকারের প্রাথমিক প্রাক্কলন তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। অবশ্য এর আগের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা থেকে সামান্য কমেছে।
বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচ্য সময়ে দেশটির উৎপাদন খাত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরের এই শিল্পখাত মূলত সেমিকন্ডাক্টর কেন্দ্রিক। ইলেকট্রনিক্স, নিখুঁত প্রকৌশল, পরিবহন প্রকৌশল এবং সাধারণ উৎপাদন খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। এর ফলে রাসায়নিক ও বায়োমেডিকেল খাতের পতনের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হয়েছে।
অন্যদিকে, নির্মাণ খাতের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ যেমন ডেটা সেন্টারের ভূমিকা রয়েছে।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রানীতির সুদের হারে কোনো পরিবর্তন আনেনি। আগামী বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা কিছুটা কমতে পারে বলে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সিঙ্গাপুরের মুদ্রাবাজার কর্তৃপক্ষ সুদের হারের পরিবর্তে মুদ্রা বিনিময়ের হারের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করে থাকে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সাল জুড়ে মূল মূল্যস্ফীতি গড়ে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক শূন্য শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমানের এই ব্যতিক্রমী গতি আগামী বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা শ্লথ হতে পারে। এছাড়া উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি চূড়ান্ত চাহিদার প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
বৈশ্বিক চিপ শিল্পে সিঙ্গাপুর একটি অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে কাজ করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে এই অবস্থান দেশটির জন্য সহায়ক হয়েছে।
সরকারি তথ্য বলছে, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ আসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্র থেকে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতির ২০ শতাংশই এখান উৎপাদিত হয়।
নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক ইয়েও হুয়ে চুয়া উচ্চ আয়ের অর্থনীতির জন্য এই পারফরম্যান্সকে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মাঝেও সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি শক্তিমত্তা দেখিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগের জোয়ার এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। ইলেকট্রনিক্সের শক্তিশালী চাহিদা উৎপাদন ও পাইকারি ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছে, যা প্রমাণ করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে অবস্থানের কারণে সিঙ্গাপুর কতটা উপকৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। এই গতি বজায় থাকলে তাইওয়ান ছাড়া অন্য যেকোনো উন্নত অর্থনীতির তুলনায় এগিয়ে থাকবে দেশটি।
এর আগে ২০২৫ সালেও দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই বছর পাঁচ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলো, যা ২০১০ ও ২০১১ সালের পর প্রথম এমন কোনো ধারাবাহিকতা।
