আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে গত ১ এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল প্রমোদতরি এমভি হন্ডিয়াস। দক্ষিণ আটলান্টিকের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর পর এই বিলাসবহুল জাহাজটি এখন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে এই ক্রুজ শিপে হান্তাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে অন্তত তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ এখন এই জাহাজের যাত্রীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, কারণ তাদের মধ্যে অনেকে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের কি এটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কারণ আছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি ও জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতি বিভাগের পরিচালক ডক্টর মারিয়া ভ্যান কারখোভ এই পরিস্থিতি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এটি কোনোভাবেই কোভিডের মতো পরিস্থিতি নয় এবং এটি কোনো নতুন মহামারির শুরুও নয়। তার মতে, হান্তাভাইরাস কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকে। হান্তাভাইরাস সাধারণত মানুষের মধ্যে উচ্চ মাত্রায় সংক্রামক নয় এবং এটি বাতাসের মাধ্যমে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে না। তাই সাধারণ জনগণের জন্য এই ভাইরাসের ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত কম বলে ডব্লিউএইচও আশ্বস্ত করেছে।
হান্তাভাইরাসের এই নির্দিষ্ট প্রাদুর্ভাবটি `আন্দিজ স্ট্রেইন` বা আন্দিজ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সাধারণত হান্তাভাইরাস ইঁদুর বা বন্য প্রাণীর মূত্র, বিষ্ঠা বা লালা থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। তবে আন্দিজ স্ট্রেইনটি বিরল ক্ষেত্রে একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে ছড়াতে পারে। এমভি হন্ডিয়াসের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। জাহাজের সীমিত ও সংকীর্ণ জায়গার মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা যাত্রীদের মধ্যে এটি ছড়িয়েছে। ডক্টর ভ্যান কারখোভের মতে, যারা একই কেবিন শেয়ার করেছেন বা খুব কাছাকাছি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, তাদের মধ্যেই সংক্রমণের ঝুঁকি সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি।
এখন পর্যন্ত এই প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে ১১ এপ্রিল এক প্রবীণ ডাচ যাত্রীর মাধ্যমে। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর তার স্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া আরও একজন জার্মান যাত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে জাহাজটিতে মোট আটজন নিশ্চিত বা সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জাহাজের বাকি যাত্রী ও ক্রুদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে এবং জাহাজটি এখন স্পেনের টেনেরিফ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
হান্তাভাইরাসের লক্ষণগুলো সাধারণত সংক্রমণের দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ পায়। এর শুরুর দিকের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, মাথা ব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং পেটের সমস্যা। রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছালে তা ফুসফুস ও হার্টের কার্যকারিতা ব্যাহত করে। যেহেতু এর কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তাই শুরুতেই রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক পরিচর্যাই জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের ইঁদুরগুলো আন্দিজ স্ট্রেইন বহন করে না এবং এটি কেবল ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ছাড়া একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে যায় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
