সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সংসারে সন্দেহ দূর করতে ইসলামের দিকনির্দেশনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৭, ২০২৬, ১১:০৫ পিএম

সংসারে সন্দেহ দূর করতে ইসলামের দিকনির্দেশনা

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে দাম্পত্য সম্পর্ককে পারস্পরিক প্রশান্তির প্রধান উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। অথচ সন্দেহ এমন এক নীরব ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে এই প্রশান্তি গ্রাস করে নেয়। নিছক অনুমান বা ভিত্তিহীন সন্দেহের কারণে বহু সুন্দর সংসার ভেঙে যায় এবং পারস্পরিক জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ইসলামে এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে। অমূলক সন্দেহ যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি করাও ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে অন্যায়।

ইসলামের প্রথম ও প্রধান নির্দেশনা হলো ভিত্তিহীন অনুমান থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ তাআলা সুরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, হে মুমিনরা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ। সন্দেহ মানুষকে এমন সব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, যার পরিণতিতে নিজেকেই অনুতাপ করতে হয়। তাই অকাট্য প্রমাণ ছাড়া বারবার সন্দেহ পোষণ করা কেবল ক্ষতিকর নয়, বরং এটি গুনাহের কাজ হিসেবেও গণ্য হয়। মুমিনের জীবন হওয়া উচিত আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সন্দেহের ওপর নয়।

দাম্পত্য জীবনে সন্দেহের অন্যতম প্রধান কারণ হলো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বা কানকথা। পরিচিত মানুষেরা হিতাকাঙ্ক্ষীর বেশে এসে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন সুরা হুজরাতের ৬ নম্বর আয়াতে, হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে। যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না করো এবং পরে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। শয়তান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ ঘটাতে সব সময় সচেষ্ট থাকে, এ সম্পর্কে তিরমিজি শরিফের ১৯৩৭ নম্বর হাদিসে স্পষ্ট সতর্কবাণী রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। সহীহ বুখারীর ২০৩৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার ইতিকাফ অবস্থায় রাসুলের স্ত্রী সাফিয়্যাহ (রা.) তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে ফেরার পথে দুজন আনসারি সাহাবি তাদের দেখে দ্রুত সরে গেলেন। রাসুল (সা.) তাদের ডেকে বললেন, থামো! ইনি আমার স্ত্রী সাফিয়্যাহ। তারা অবাক হলে তিনি বললেন, শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহে চলাচল করে। আমি আশঙ্কা করলাম, সে তোমাদের মনে কোনো সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে পারে। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি না করা এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা নববী আদর্শের অংশ।

সংসারে সন্দেহ দেখা দিলে গোপনে ফোন তল্লাশি বা নজরদারির পথ অবলম্বন করা ইসলামি রীতির পরিপন্থী। সুরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন, তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না। স্বামী বা স্ত্রী যখন মনে কোনো শঙ্কা বোধ করেন, তখন আড়ালে তদন্ত না করে খোলামেলা আলোচনা করাই একমাত্র সমাধান। রেগে না গিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরস্পরের কথা শোনা এবং আশ্বস্ত করাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ। পরিস্থিতি যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে পরিবারের হিতাকাঙ্ক্ষী গুরুজন বা বিশ্বস্ত আলেমদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

কেবল সন্দেহ পোষণ করা নয়, বরং সন্দেহের উপলক্ষ তৈরি করাও ইসলামে অনুচিত। স্বামী বা স্ত্রী যদি পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখেন বা অস্পষ্টতা তৈরি করেন, তবে তা সন্দেহের বীজ বপন করে। আল্লাহ সুরা নুরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারী ও পুরুষদের তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পরস্পরের প্রতি স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোই সুখী সংসারের মূল চাবিকাঠি। গোপনীয়তা অবলম্বন না করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখলে সন্দেহ বাসা বাঁধার সুযোগ পায় না।

দাম্পত্য কলহ ও সন্দেহ দূর করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ দোয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিরমিজি শরিফের ৩৪৮১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত দোয়ায় বলা হয়েছে, হে আল্লাহ! আমাকে সুপথ নসিব করুন এবং আমাকে মনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। সুখী সংসারের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি পাঠ করতে পারেন। আল্লাহভীরু জীবনযাপন করলে আল্লাহ সংসারে প্রশান্তি দান করেন। সুরা তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পথ করে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে জীবিকা দান করেন। সততা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহভীতিই পারে সন্দেহ দূর করে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

banner
Link copied!