বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যকর্ম উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের ১৯৫৪ সালের উপন্যাস লর্ড অব দ্য ফ্লাইস আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একটি নির্জন দ্বীপে আটকা পড়া একদল কিশোরের বুনো সহিংসতায় মেতে ওঠার এই অন্ধকার গল্পটি নতুন করে রূপদান করেছেন অ্যাডোলেসেন্স খ্যাত লেখক জ্যাক থোর্ন। নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া নতুন এই টিভি সিরিজটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্বজুড়ে ঘৃণা এবং বিভাজনের প্রকোপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই ধ্রুপদী কাহিনীটি বর্তমানে আমাদের চারপাশের রূঢ় বাস্তবতার এক অসাধারণ প্রতিফলন হিসেবে কাজ করছে।
উপন্যাসটি প্রকাশের সাত দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এর মূল উপজীব্য অর্থাৎ মানুষের ভেতরে থাকা অশুভ সত্তার স্বরূপ উন্মোচন আজও প্রাসঙ্গিক। ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক টিম কেন্ডাল মনে করেন যে একটি গল্পের মৌলিক অর্থ অপরিবর্তিত থাকলেও বিশ্বের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তার গুরুত্ব বারবার পরিবর্তিত হয়। তার মতে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গোল্ডিংয়ের সেই প্রশ্নগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রজন্ম যখন প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে উঠছে তখন এই গল্পটি তাদের কাছে এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
গোল্ডিংয়ের কন্যা এবং তার সাহিত্যিক এস্টেটের পরিচালক জুডি কার্ভার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে প্রতিটি ভালো বই তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভিন্নভাবে ধরা দেয়। তার বাবা বিশ্বাস করতেন যে একটি বই প্রকাশের পর তার ওপর লেখকের আর কোনো একক অধিকার থাকে না বরং পাঠকদের নিজস্ব ব্যাখ্যাই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেটফ্লিক্সের এই নতুন সংস্করণে জ্যাক থোর্ন মূল উপন্যাসের কাহিনীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও আধুনিক দর্শকদের জন্য কিছু নতুনত্ব যোগ করেছেন যা বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
জ্যাক থোর্ন নিজের কৈশোরের কথা স্মরণ করে বলেন যে নব্বইয়ের দশকের দিকে বিশ্বের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচকতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহ ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়টি তার কাছে বেশ ভিন্ন এবং কঠিন মনে হয়। তার মতে আজকের পৃথিবীতে মানুষের জন্য অন্যকে ভালোবাসা বা সাহায্য করার চেয়ে ঘৃণা করা বা ছোট করা অনেক বেশি সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি গোল্ডিংয়ের মূল চেতনাকে পর্দায় তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। টেলিভিশনের প্রতিটি পর্বকে তিনি একটি বইয়ের অধ্যায়ের মতো সাজিয়েছেন যেখানে চারটি আলাদা কিশোর চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরো গল্পটি বর্ণনা করা হয়েছে।
সিনেমার তুলনায় দীর্ঘ টিভি সিরিজ এই উপন্যাসের গভীরতা অন্বেষণে বেশি সহায়ক হয়েছে বলে মনে করেন থোর্ন। তিনি কিশোরদের ব্যক্তিগত অতীত ইতিহাস বা ব্যাকস্টোরি যোগ করেছেন যা দর্শকদের বুঝতে সাহায্য করে যে কীভাবে সাধারণ কিছু কিশোর পরিস্থিতির চাপে বন্য আচরণ শুরু করতে পারে। স্টিফেন কিং থেকে শুরু করে অসংখ্য আধুনিক লেখক এই উপন্যাসটিকে তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি হালের জনপ্রিয় ইয়েলোজ্যাকেটস সিরিজের মধ্যেও লর্ড অব দ্য ফ্লাইসের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ের বিভাজিত বিশ্বে এই গল্পটি কেবল একটি ধ্রুপদী সাহিত্য নয় বরং এটি মানুষের নৈতিকতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।
