বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

সৌদির পারমাণবিক চুক্তি আব্রাহাম চুক্তির ওপর নির্ভরশীল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

সৌদির পারমাণবিক চুক্তি আব্রাহাম চুক্তির ওপর নির্ভরশীল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সাথে স্বাক্ষরিত বেসামরিক পারমাণবিক সহায়তা চুক্তিটিকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের শর্তযুক্ত করেছেন বলে বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই ট্রাম্পের দেওয়া এই ঘোষণার ফলে দুই দেশের মধ্যে সদ্য ঘোষিত বহু বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি বা মার্কিন শক্তি বিভাগ এই চুক্তির কথা ঘোষণা করার ঠিক একদিন পরই ট্রাম্প এই আকস্মিক শর্তের কথা প্রকাশ করলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বিবৃতি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন যে মার্কিন শক্তি বিভাগ ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পাদিত এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিটি অনুমোদিত হবে, তবে এটি পুরোপুরিভাবে আব্রাহাম চুক্তিতে সৌদি আরবের যোগদানের ওপর নির্ভরশীল। তিনি দাবি করেন যে চুক্তিটিতে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ রাখা হবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল অ-সমৃদ্ধ বেসামরিক পারমাণবিক সুবিধার বিরোধী নয়। মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে প্রস্তাবিত চুক্তিতে সৌদি আরবকে দেশীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার দেওয়া হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রকাশ্যে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অনুমোদন করা হবে না।

মার্কিন শক্তি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি শক্তি মন্ত্রী যুবরাজ আবদুলআজিজ বিন সালমান গত ২২ জুলাই একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এবং একটি দ্বিপক্ষীয় সেফগার্ড চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ১২৩ চুক্তি নামে পরিচিত এই সমঝোতার মেয়াদ ৩০ বছর এবং এর মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও প্রযুক্তি সরবরাহের সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত প্রোটোকল মেনে চলার বাধ্যবাধকতা এতে না থাকায় মার্কিন কংগ্রেসের অনেক আইনপ্রণেতা এই চুক্তি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের মতে, সৌদি আরবকে সমৃদ্ধকরণ সুবিধা বা পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া পারমাণবিক প্রযুক্তি দিলে মধ্যপ্রাচ্যে এক বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা হতে পারে।

ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ফিলিস্তিন সংকট সমাধান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নীতিতে অটল রয়েছে। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। তবে ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে যেকোনো আলোচনা বাস্তবসম্মতভাবে থমকে যায়।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর সাথে ইরানের সামরিক সংঘাত চলমান রয়েছে যা শুরু হয়েছিল মূলত তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। এর মাঝেই রিয়াদের সাথে এই পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় নীতির অসংগতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন যে যেকোনো বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিতে কঠোর সুরক্ষাকবচ থাকবে যাতে তা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে না পারে। চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে রিয়াদকে দূরে রাখতেই এই বেসামরিক চুক্তি করা হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন কংগ্রেস এই বিতর্কিত চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে অনুমোদন করবে এবং ট্রাম্পের আরোপ করা আব্রাহাম চুক্তির বাধ্যবাধকতা রিয়াদ কীভাবে গ্রহণ করবে। সৌদি আরব তাদের জ্বালানি খাতকে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী করার লক্ষ্যে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির পরিকল্পনা জোরদার করেছে। তবে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে উপেক্ষা করে ট্রাম্পের শর্ত মেনে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া সৌদি রাজপরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হবে। শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই পারমাণবিক প্রস্তাব কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

banner
Link copied!