জাতীয় নির্বাচনে বিদেশি শক্তির অবৈধ হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে মেক্সিকো। দেশটিতে যেকোনো নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে পুরো নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার বিধান রেখে একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করেছে দেশটির আইনসভার নিম্নকক্ষ। তবে সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। তাদের মতে, এই নতুন আইনটির কারণে বৈধ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এবং ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার একটি বিতর্কিত সুযোগ তৈরি হবে।প্রস্তাবটি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে বিপুল ভোটে পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর চেম্বার অব ডেপুটিজে বা নিম্নকক্ষে বিলটির পক্ষে ৩০৭টি ভোট পড়ে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১২৮ জন আইনপ্রণেতা এবং একজন ভোটদানে বিরত ছিলেন। এই ভোটাভুটির পর মেক্সিকোর সংবিধানে নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের যোগ্যতার তালিকায় নতুন করে `বিদেশি হস্তক্ষেপ` শব্দবন্ধটি যুক্ত করার পথ উন্মুক্ত হলো। তবে আইনটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে হলে দেশটির উচ্চকক্ষ বা সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের জুনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দেশটির পরবর্তী ফেডারেল নির্বাচনের আগে এই আইন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
নতুন এই সংস্কার প্রস্তাবে বিদেশি হস্তক্ষেপের সংজ্ঞা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে যেকোনো ধরনের অবৈধ অর্থায়ন, প্রোপাগান্ডা, পদ্ধতিগতভাবে মিথ্যা তথ্য বা অপপ্রচার ছড়ানো, ডিজিটাল মাধ্যমে জনমত ম্যানিপুলেট করা এবং বিদেশি কোনো সরকার বা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপ। এ ছাড়া জনমতকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা গণমাধ্যমজনিত চাপও এই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ক্ষমতাসীন মোরেনা পার্টির নিম্নকক্ষের নেতা রিকার্ডো মনরিল এই সংশোধনীর পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, মেক্সিকোর সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে এই ধরনের সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচ অত্যন্ত জরুরি ছিল যাতে বাইরের কোনো শক্তি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারে। তবে একই সঙ্গে মনরিল একটি সম্পূরক আইন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন যা নির্ধারণ করত কীভাবে এই হস্তক্ষেপের তদন্ত পরিচালিত হবে। আগামী নির্বাচন চক্রের আগে এই সম্পূরক বিধিমালা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় নেই বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দল ন্যাশনাল অ্যাকশন পার্টির (পিএএন) সমন্বয়কারী হোসে এলিয়াস লিক্সা সরকারের এই যুক্তি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আইনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, এই আইনের বিরোধিতা করার অর্থ এই নয় যে তারা বিদেশি হস্তক্ষেপকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লবী দলের (পিআরআই) রুবেন মোরেরা ভালদেস প্রশ্ন তুলেছেন যে এই অস্পষ্ট আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমের সংবাদ মেক্সিকোতে প্রচারিত হলে তা হস্তক্ষেপে হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম আইন পাসের পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, মেক্সিকোর নির্বাচনে বাইরের প্রভাব বিস্তারের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং অতীতেও স্থানীয় কিছু প্রার্থী ও সংস্থায় বিদেশি তহবিল আসার নজির দেখা গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মন্তব্য ও সমালোচনা মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে বলে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করছেন।
