ব্রিটেনের আইনজীবীদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড শুক্রবার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বলে রয়টার্স এবং আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। এই বরখাস্তের সিদ্ধান্তটি আজ থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও করিম খানকে তার পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছিল। ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ আইনজীবী দীর্ঘদিন ধরে সুদান, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সঙ্গে জড়িত শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে হাই-প্রোফাইল মামলার প্রসিকিউশন পরিচালনা করে আসছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিজের কার্যালয়ের একজন নারী সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং যৌন অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১৮ মাস ধরে চলা একটি গোপন অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে আদালতের প্রশাসনিক পর্ষদ। করিম খান শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন এবং একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড জানিয়েছে যে তাদের নিজস্ব নিয়ম ও প্রয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী এই অন্তর্বর্তীকালীন বরখাস্তের বিষয়টি আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে একটি বিশেষ প্যানেলের শুনানিতে বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করা হবে। তবে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দুই কর্মী প্রথম এই অসদাচরণের বিষয়টি আদালতের নিজস্ব ওয়াচডগ বা তদারকি সংস্থার নজরে এনেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই তদন্ত প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল কারণ সংশ্লিষ্ট নারী কর্মী কর্মক্ষেত্রে প্রতিশোধের ভয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আদালতের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কার্যনির্বাহী কমিটি এই তদন্ত পর্যালোচনা করে এবং করিম খানের আচরণকে গুরুতর পেশাগত নিয়মভঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে অপসারণের সুপারিশ করে। আদালতের গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে আগামী মাসে একটি বিশেষ ভোটাভুটির আয়োজন করার কথা রয়েছে যেখানে তাকে স্থায়ীভাবে প্রসিকিউটরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে কিনা তা নির্ধারণ করা হবে।
আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে আইনি পেশার সততা ও জননিরাপত্তা রক্ষা করার স্বার্থে এই ধরনের জরুরি স্থগিতাদেশ দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। করিম খানের আইনজীবীরা একটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছেন যে ব্রিটিশ আইনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তটি মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়েছে। তারা মনে করেন যে আসন্ন শুনানিতে তাদের মক্কেল নিজের নির্দোষিতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হবেন এবং তার পেশাগত লাইসেন্স ফিরে পাবেন। এই ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক স্বাধীনতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে এর কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এক ধরনের বড় চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক আইন অঙ্গনে করিম খানের এই আকস্মিক পতনকে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে যা বিশ্বজুড়ে এই আদালতের ভাবমূর্তি এবং চলমান বড় মামলাগুলোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বনেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের পরোয়ানা জারির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক বিষয়ে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যা কম স্পষ্ট তা হলো তার এই দীর্ঘস্থায়ী অনুপস্থিতিতে আদালতের বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ গতিপথ কেমন হবে এবং নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রসিকিউটর কীভাবে এই বৈশ্বিক সংকট সামাল দেবেন। বিশ্বজুড়ে আইনি বিশেষজ্ঞরা এখন গভীর উদ্বেগের সাথে এই মামলার পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর রাখছেন।
