দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আদালত শুক্রবার সিউলে দেশটির সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হিকে রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ ঘুষ গ্রহণের দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ২৬ জুন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে এবং একই সাথে তাকে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ওন জরিমানা করার নির্দেশ দেয়। আদালতের প্রধান বিচারপতি জো সুন-পিও রায়ে উল্লেখ করেন যে কিম কিয়ন হি নিজের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি পদ এবং ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অত্যন্ত মূল্যবান উপহার নিয়েছিলেন। সাবেক এই ফার্স্ট লেডি শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসলেও আদালত তার সব আইনি যুক্তি খণ্ডন করে এই দীর্ঘ কারাবাসের সাজা প্রদান করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে যা কল্পনা করাও কঠিন সেই স্তরের মূল্যবান সামগ্রী তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই গ্রহণ করেছিলেন বলে আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানায়।
রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী সিউলের সেওহি কনস্ট্রাকশন নামের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান লি বং-কোয়ানের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি ৩৮ লাখ ওন মূল্যের মূল্যবান হিরার নেকলেস ও অলংকার গ্রহণ করার অভিযোগ আদালতে পুরোপুরি প্রমাণিত হয়েছে। এর সরাসরি বিনিময়ে ওই ব্যবসায়ীর জামাতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন কিম। এছাড়াও একটি রোবোটিক কুকুর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সেও সুং-বিন এবং ন্যাশনাল এডুকেশন কমিশনের সাবেক প্রধানের কাছ থেকে সোনার কচ্ছপ ও ভ্যাসেরন কনস্ট্যান্টিন ব্র্যান্ডের বহুমূল্য ঘড়ি নেওয়ার বিষয়টি আদালতে নথিপত্রসহ খতিয়ে দেখা হয়। চয় জে-ইয়ং নামের একজন যাজকের কাছ থেকে একটি নামী ফরাসি ব্র্যান্ডের ডিয়র হ্যান্ডব্যাগ ও অন্যান্য উপহার গ্রহণের গোপন ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক এই ফার্স্ট লেডি বর্তমানে শেয়ার বাজার কারসাজি এবং দেশটির ইউনিফিকেশন চার্চের কাছ থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অন্য একটি পৃথক মামলায় চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তার স্বামী এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলও বর্তমানে কারাগারে আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বিতর্কিত সামরিক আইন জারির ব্যর্থ চেষ্টা এবং উত্তর কোরিয়ার আকাশে সামরিক ড্রোন পাঠানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান ঘটানোর অভিযোগে ইউন সুক ইওলকে ২০২৫ সালে অভিশংসনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ইউন সুক ইওল তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব দুর্নীতির তদন্ত বন্ধ করতে তিনবার বিরোধী দল সমর্থিত বিশেষ তদন্ত বিল ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে বাতিল করেছিলেন।
কিম কিয়ন হির নিজস্ব আইনি প্রতিনিধি দল এই ঐতিহাসিক রায়ের পর তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে। তাদের দাবি সিউলের কেন্দ্রীয় আদালত অপর্যাপ্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত কঠোর ও একপেশে রায় দিয়েছেন যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিম আদালতে দাবি করেছিলেন যে এই উপহারগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে বিনিময় করা হয়েছিল এবং এর সাথে কোনো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সুবিধার দূরতম সম্পর্ক ছিল না। তবে আদালত তার রায়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে দেশের সর্বোচ্চ পদের অংশীদার হিসেবে তার যেখানে সর্বোচ্চ আত্মসংযম দেখানো উচিত ছিল সেখানে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে বাণিজ্যের উপাদানে পরিণত করেছেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই কঠোর রায়ের ফলে দেশটির বর্তমান দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বিচার বিভাগের ওপর সাধারণ জনমানুষের আস্থা কতখানি পুনরুদ্ধার হবে। সিউলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে সরকারি পদ ক্রয়ের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান লি বং-কোয়ানকেও এক বছরের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সমগ্র ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের একটি অন্যতম স্বাধীন ও সাহসী আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
