যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র দাবদাহের কারণে ৫০ বছরের তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙে একটি নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে বলে দেশটির আবহাওয়া দপ্তর বা মেট অফিস নিশ্চিত করেছে, আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। গত ২৪ জুন হ্যাম্পশায়ারের গোসপোর্ট নামক স্থানে তাপমাত্রা রেকর্ড ৩৬.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় যা ১৯৭৬ সালের পর জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র এই তাপপ্রবাহের কারণে দেশটির গণপরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধীর হয়ে পড়েছে এবং শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে যে ইউরোপ জুড়ে চলমান এই অস্বাভাবিক ও চরম আবহাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁких মুখে ফেলে দিচ্ছে। আকস্মিক এই আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে পুরো দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
লন্ডন ও এর আশেপাশের অঞ্চলে তীব্র গরমের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং বৈদ্যুতিক পাখার চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজারগুলোতে এগুলো সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে। অনেক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন যে নতুন অর্ডারের জন্য ক্রেতাদের অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে যা অসুস্থ ও দুর্বল মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। মেট অফিসের পক্ষ থেকে দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বড় অংশ জুড়ে একটি বিরল লাল সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে এবং সপ্তাহের শেষ নাগাদ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। লন্ডনের ওয়াটারলু স্টেশনসহ প্রধান প্রধান রেল স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের কেবল জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে রেললাইনগুলো বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় ট্রেনগুলোর গতি অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের বর্তমান অবকাঠামো কতটা দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে। মেট অফিসের প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টিফেন বেলচার জানান যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই ধরনের চরম ও তীব্র তাপপ্রবাহ এখন ঘন ঘন আঘাত হানছে। এর আগে গত মে মাসেও দেশটিতে রেকর্ড তাপমাত্রা অনুভূত হয়েছিল যা সামগ্রিক জলবায়ু বিপর্যয়ের একটি বড় ইঙ্গিত বহন করে। লন্ডনের জলবায়ু একশন সপ্তাহের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট এই চরম আবহাওয়ার কারণে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকরা। পরিবেশবিদদের মতে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন ভবনগুলো সাধারণত ঘরের ভেতরে তাপ ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল যার ফলে এই চরম গরমে সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরে শ্বাসকষ্টসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থাও দেশের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলসহ একাধিক এলাকায় লাল স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে যা জনগণের সামগ্রিক সুরক্ষাকে নির্দেশ করে। ব্রিস্টল, গ্লুচেস্টারশায়ার এবং হ্যাম্পশায়ারের প্রায় এক হাজারেরও বেশি স্কুল ও নার্সারি আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্মের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। রাতের বেলাতেও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারছেন না যা তাদের শারীরিক ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও এই চরম পরিস্থিতিকে জলবায়ু সংকটের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই কঠিন সময়ে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
