মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের দেশে প্রবেশের আগেই ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে আইনি সবুজ সংকেত দিয়েছে বলে আল জাজিরা ও এনপিআর নিশ্চিত করেছে। এই রায়ের ফলে মেক্সিকো সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের বাধা দেওয়ার বিতর্কিত মিটারিং নীতি পুনরায় চালু করার পথ সুগম হলো যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী কঠোর অবস্থানকে আইনিভাবে আরও শক্তিশালী করবে। সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির মধ্যে ছয়জন রক্ষণশীল বিচারপতি এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেন এবং তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি এর বিপক্ষে তীব্র ভিন্নমত পোষণ করেন। এই ঐতিহাসিক আইনি সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ববর্তী একটি নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেল যেখানে মার্কিন সীমান্ত এজেন্টদের এই ধরনের পুশব্যাক প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের পক্ষে মূল রায় ও মতামত প্রকাশ করে রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো জানান যে মেক্সিকোর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বিদেশী নাগরিককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌঁছেছেন বলে গণ্য করা যাবে না। তিনি মার্কিন অভিবাসন আইনের একটি ধারার ব্যাখ্যা দিয়ে একটি বাড়ির দরজায় টোকা দেওয়ার সাধারণ উদাহরণ প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে কোনো অতিথি যখন কোনো বাড়ির সদর দরজায় এসে কড়া নাড়েন তখন তিনি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছেন বলে ধরে নেওয়া যায় না। আদালতের এই ব্যাখ্যার ফলে যতক্ষণ না কোনো আশ্রয়প্রার্থী সশরীরে মার্কিন ভূখণ্ডে পা রাখছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করার আইনি অধিকার পাবেন না এবং সীমান্ত কর্মকর্তারা তাকে প্রবেশদ্বারে আটকে রাখতে পারবেন।
অপরদিকে ভিন্নমত পোষণকারী তিন উদারপন্থী বিচারপতির পক্ষে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় লিখিত একটি দীর্ঘ নোট পেশ করেন বিচারপতি সোনিয়া সোতোমেওর। পঁয়ত্রিশ পৃষ্ঠার সেই নোটে তিনি উল্লেখ করেন যে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন দেশের প্রচলিত মানবিক ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি বিপজ্জনক সুযোগ পেয়ে গেল। তিনি যুক্তি দেন যে কোনো আশ্রয়প্রার্থী যদি সীমান্ত প্রবেশদ্বারে এসে পৌঁছান এবং সেখানে তার আবেদন যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রীয় সামর্থ্য থাকে তবুও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অমানবিক। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এর ফলে নিজ দেশে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হওয়া অসহায় মানুষগুলো নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করে জানিয়েছে যে এটি সীমান্তে চলমান মানবিক সংকটকে আরও মারাত্মক করে তুলবে। তাদের মতে বৈধ প্রবেশদ্বারগুলোতে এভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করা হলে তারা বাধ্য হয়ে মরুভূমি বা দুর্গম নদীপথের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পথ বেছে নেবে যা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দেবে। এর আগে ওবামা প্রশাসনের সময় এই নীতি আংশিকভাবে চালু করা হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা স্থগিত হয়ে পড়েছিল।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন আইনি নির্দেশনার পর আগামী দিনগুলোতে মেক্সিকো সীমান্তে সাময়িক ক্যাম্পে আটকে থাকা হাজার হাজার শরণার্থীর মানবিক প্রয়োজন ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য আদালতের এই রায়কে একটি বড় জয় হিসেবে দেখছে এবং তাদের দাবি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপরাধী চক্রের অপতৎপরতা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশ্বজুড়ে থাকা অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এই রায়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনি কাঠামো এবং শরণার্থী নীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে।
