ইউক্রেনীয় বাহিনী বৃহস্পতিবার ভোররাতে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড এবং অধিভুক্ত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে মস্কোর নিয়োজিত গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ নিশ্চিত করেছেন, এএফপি ও রয়টার্স জানিয়েছে। আকস্মিক এই হামলায় একটি শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। রুশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেন সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলের আকাশসীমায় রাতভর এই তীব্র লড়াই চলে। ক্রেমলিন এই হামলাকে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর একটি কাপুরুষোচিত আক্রমণ বলে বর্ণনা করেছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্রিমিয়া উপদ্বীপের মস্কো নিযুক্ত গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান যে সেখানে রাতভর শত্রুভাবাপন্ন হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন যার মধ্যে একটি নিরপরাধ শিশু রয়েছে। এছাড়া এই হামলায় আরও অন্তত দুইজন বাসিন্দা আহত হয়েছেন যাদের স্থানীয় হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সীমান্তবর্তী ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় আরও দুইজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বেলগোরোদ অঞ্চলেও পৃথক একটি ড্রোন হামলায় একজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতভর অভিযান চালিয়ে ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার আকাশসীমা থেকে মোট ২৬৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো ইউক্রেনের এই সুদূরপ্রসারী ড্রোন হামলার আসল কৌশলগত লক্ষ্য কী ছিল এবং এতে রাশিয়ার মূল সামরিক ঘাঁটির কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা। ক্রাসনোদার ক্রাই অঞ্চলের ক্রাসনোরমেয়স্ক জেলার প্রধান আলেকসান্ডার খারিটোনভ রাষ্ট্রে পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্মে জানিয়েছেন যে একটি ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ সরাসরি পোলতাভস্কায়া তেল ডিপোতে গিয়ে পড়ে। এর ফলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় এবং কালো ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট কয়েক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় সেই বিধ্বংসী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের এই ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মস্কো কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রোমানিয়ার কনসাল জেনারেলকে রাশিয়া থেকে বহিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছে ক্রেমলিন যা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনীয় হামলা ও তীব্র ক্ষয়ক্ষতির কারণে পুরো উপদ্বীপ জুড়ে জরুরি বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা লোডশেডিং জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মস্কো প্রশাসন। গভর্নর আকসিওনভ জানিয়েছেন যে শত্রুভাবাপন্ন দেশের হামলার কারণে অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে সাময়িকভাবে পুরো ক্রিমিয়া জুড়ে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হবে যাতে জরুরি সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা যায়। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই ধরনের বড় আকারের ড্রোন হামলা আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং ধ্বংসাত্মক করে তুলবে। বিশ্বজুড়ে থাকা যুদ্ধবিরোধী মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবিলম্বে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এই সংঘাতের ফলে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে ড্রোন হামলার কারণে বেশ কয়েকটি অঞ্চলের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল সাময়িকভাবে রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ইউক্রেন অবশ্য সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার গভীরে তেল শোধনাগার এবং সামরিক লজিস্টিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের বিমান হামলা বহুগুণ জোরদার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে এই জাতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা কঠোর সামরিক জবাব দেবেন এবং দেশের সীমানা সুরক্ষায় অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা এখন যুদ্ধের এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছেন।
