শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা আদালতের ঐতিহাসিক রায়: সাজা পেলেন রাজনীতিবিদরা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২৬, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা আদালতের ঐতিহাসিক রায়: সাজা পেলেন রাজনীতিবিদরা

মরক্কোর ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার একটি আপিল আদালত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মরক্কোয় মাদক চোরাচালান মামলায় দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বসহ মোট ২৯ জনকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিয়েছে বলে এএফপি ও এপি নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ঐতিহাসিক বিচার প্রকিয়ার রায়কে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা আদালতের বিচারক আলী তর্চি এই স্পর্শکاتর মামলার রায় ঘোষণা করার সময় বিপুল পরিমাণ আর্থিক জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেন। আদালতের এই কঠোর রায় ঘোষণার সাথে সাথেই জনাকীর্ণ আদালত কক্ষের ভেতরে তীব্র উত্তেজনা ও কান্নাকাটির রোল পড়ে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হয়।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিরা হলেন মরক্কোর ক্ষমতাসীন অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টির শীর্ষস্থানীয় সদস্য এবং ওরিয়েন্টাল রিজিওনাল কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি আবদেলনবী বিওই, যাকে এই মরক্কোয় মাদক চোরাচালান মামলায় সরাসরি জড়িত থাকা এবং সরকারি নথিপত্র জালিয়াতির দায়ে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সাথে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব ওয়াইদাদ ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার সাবেক সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাইদ নাসিরিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপর একজন সাবেক সংসদ সদস্য বেলকাসেম মীরকেও জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ এবং মানব পাচারের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই তিন মূল পরিকল্পনাকারীর বাইরে মামলার অন্য ২৬ জন আসামিকে তাদের অপরাধের ধরন অনুযায়ী ২ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

সমগ্র মামলাটির সূত্রপাত হয়েছিল আল হাজ আহমেদ বিন ইব্রাহিম নামের একজন কুখ্যাত মালিয়ান মাদক ব্যবসায়ীর দেওয়া চাঞ্চল্যকর জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে। সাহারার পাবলো এসকোবার নামে পরিচিত এই মাদক সম্রাট ২০১৯ সালে মরক্কোয় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে বর্তমানে ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তিনি বিচারবিভাগীয় তদন্তকারীদের কাছে অভিযোগ করেন যে তার সাবেক মরক্কোন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সহযোগীরা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি কারাগারে থাকার সুযোগে তারা তার লক্ষ লক্ষ ডলার মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট এবং দামি গাড়ি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। এই জবানবন্দির পর শুরু হওয়া তদন্তে জানা যায় যে এই চক্রটি উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে হাজার হাজার টন মরক্কোন ক্যানাবিস রেজিন বা গাঁজা এবং লাতিন আমেরিকা থেকে আসা কোকেনের বিশাল চালান পাচার করত।

আদালত শুধুমাত্র কারাদণ্ড দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং অপরাধীদের অবৈধ আর্থিক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে শত শত মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ জরিমানা ধার্য করেছে। বিচারক আলী তর্চি তিন মূল সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ মরক্কোন দিরহাম সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি দেশটির শুল্ক ও পরোক্ষ কর প্রশাসনকে শত শত কোটি দিরহাম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যৌথ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগ এই তিন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পরিশোধ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন এবং সোনা চোরাচালানের দায়েও আসামিদের পৃথকভাবে বিপুল অংকের জরিমানা করা হয়েছে। এই ভয়াবহ কেলেঙ্কারি মরক্কোর রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতির পরিধি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং দেশের রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ আইনপ্রণেতাদের নৈতিক আচরণ বিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই কঠোর বিচার বিভাগীয় পদক্ষেপের পর এবং মরক্কোয় মাদক চোরাচালান মামলায় দৃষ্টান্তমূলক সাজার জেরে মরক্কোর অভ্যন্তরে গভীরভাবে জেঁকে বসা মাদক পাচার ও রাজনৈতিক দুর্নীতির চক্রকে কতটা নির্মূল করা সম্ভব হবে। যদিও মরক্কো সরকার সম্প্রতি চিকিৎসা ও শিল্প ব্যবহারের জন্য ক্যানাবিস বা গাঁজা চাষকে বৈধতা দিয়েছে, তবুও ইউরোপের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবৈধ মাদক চোরাচালান এখনো একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে। মরক্কোর সাধারণ মানুষ এই রায়কে স্বাগত জানালেও ক্ষমতার শীর্ষস্তরে থাকা ব্যক্তিদের এমন পতন দেশটির প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

banner
Link copied!