মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

সহিংসতাকে রোগ বিবেচনা করে যেভাবে নিরাপদ হলো স্কটল্যান্ড

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২৯, ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম

সহিংসতাকে রোগ বিবেচনা করে যেভাবে নিরাপদ হলো স্কটল্যান্ড

স্কটল্যান্ড কর্তৃপক্ষ বিগত দুই দশকে গ্লাসগো শহরের গ্যাং সহিংসতা দমনে অপরাধকে একটি সামাজিক রোগ বা জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিকিৎসা করে সফলভাবে অপরাধের হার কমিয়ে এনেছে বলে বিবিসি নিউজ তাদের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। এই অভিনব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এক সময়ের চরম বিপজ্জনক অবস্থা থেকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে গৃহীত এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে জানা যায় যে, দুই হাজার তিন থেকে দুই হাজার পাঁচ সালের মধ্যে গ্লাসগো শহরে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটতো। জাতিসংঘ সে সময় স্কটল্যান্ডকে উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের ওপর হামলার আশঙ্কা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল। স্কটল্যান্ডের তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো প্রতিনিয়ত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড এবং রক্তাক্ত গ্যাং যুদ্ধের লোমহর্ষক খবরে পূর্ণ থাকতো যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। সে সময় স্কটল্যান্ডের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বুঝতে পেরেছিল যে কেবল প্রচলিত কারাগার বা কঠোর শাস্তি দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী অপরাধের সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয়।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই হাজার পাঁচ সালে দেশটির পুলিশ বিভাগ একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করে যা পরবর্তীতে দুই হাজার can সালে স্কটিশ সরকার কর্তৃক দেশব্যাপী একটি জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে সম্প্রসারিত হয়। এই বিশেষ সংস্থাটি প্রচলিত কঠোর আইনি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে অপরাধীদের মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ জোর দেয়। তারা সহিংসতাকে একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসের মতো রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর বিস্তার রোধে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সরাসরি কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার কৌশল গ্রহণ করে।

এই অভিনব উদ্যোগের অংশ হিসেবে দুই হাজার আট সালের চব্বিশ অক্টোবর গ্লাসগো শেরিফ আদালতে এক নজিরবিহীন শুনানির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রথাগত কোনো জুরি, সাক্ষী বা আসামি ছিল না, বরং আদালতের বিচারকের সামনে সরাসরি উপস্থিত করা হয়েছিল পূর্ব গ্লাসগোর পঁচাশি জন শীর্ষ গ্যাং সদস্যকে। তাদের সামনে চিকিৎসকেরা ছুরিকাঘাতের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক পরিণতির বাস্তব বিবরণ দেন এবং ভুক্তভোগী মায়েরা তাদের সন্তানদের ওপর হওয়া নৃশংস হামলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই ঐতিহাসিক সেশনে অংশ নেওয়া যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য একটি বিশেষ নম্বর দেওয়া হয় যেখানে পরবর্তীতে প্রায় চারশত যুবক যোগাযোগ করে অপরাধের পথ চিরতরে ত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

এই দীর্ঘমেয়াদি এবং মানবিক কৌশলের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে গ্লাসগো শহরে খুনের হার প্রায় ছাপান্ন শতাংশ এবং সামগ্রিকভাবে পুরো স্কটল্যান্ডে আটত্রিশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দুই হাজার can থেকে দুই হাজার পনেরো সালের মধ্যে দেশটির সামগ্রিক সহিংস অপরাধ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে এসেছে এবং বর্তমানে স্কটল্যান্ডে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা গত বিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। স্কটল্যান্ড এখন সুইডেন, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের চেয়েও মাথাপিছু কম অপরাধের হার নিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে শান্ত অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই চিকিৎসাভিত্তিক মডেলটি বিশ্বের অন্যান্য চরম অপরাধপ্রবণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে কতটুকু সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে কারণ প্রতিটি দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয়। তবে স্কটল্যান্ডের এই ঐতিহাসিক রূপান্তর এটিই প্রমাণ করে যে অপরাধকে কেবল কারাগার বা কঠোর আইনি শাস্তি দিয়ে নয়, বরং সঠিক মনস্তাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব। দেশটির এই সফল রূপান্তরের গল্প এখন সারা বিশ্বের সমাজবিজ্ঞানী এবং নীতি নির্ধারকদের কাছে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

banner
Link copied!