মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্র নির্মাণের রোমাঞ্চকর অজানা ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২৯, ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্র নির্মাণের রোমাঞ্চকর অজানা ইতিহাস

ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির এক অনন্য ও মেগা প্রজেক্টের রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও পর্দার পেছনের অজানা গল্প উন্মোচন করেছে বিবিসি নিউজ। উনিশশত ঊনআশি সালের জুলাই মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সাদ্দাম হোসেন ইরাকে একটি আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যাকে তিনি টাইগ্রিস নদীর তীরে হলিউড বা বলিউড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি উনিশশত বিশ সালের ব্রিটিশ বিরোধী ইরাকি বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা নিয়ে একটি বিশাল চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ক্লাশ অব লয়্যালটিজ বা আল-মাসআলা আল-কুবরা। এই চলচ্চিত্রে সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ইরাকের একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি তুলে ধরার এক মরিয়া চেষ্টা প্রকাশ পেয়েছিল।

চলচ্চিত্রটির ইরাকি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রযোজক লতিফ জোরফানি বিবিসি নিউজকে জানান যে, প্রায় তিন বছর ধরে ধারণ করা এই মেগা সিনেমার বাজেট ছিল  সময়ে প্রায় তিন কোটি মার্কিন ডলার, যা বর্তমান সময়ের মুদ্রাস্ফীতি হিসাবে প্রায় দশ কোটি ডলারের সমতুল্য। সিনেমাটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা অলিভার রিড এবং এর শুটিংয়ের জন্য হলিউড স্টাইলের বিশাল সেট ও শত শত যুদ্ধ সরঞ্জাম বাগদাদে নিয়ে আসা হয়েছিল। ইরাক সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিশাল আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের খরচের ব্যাপারে সাদ্দাম হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি যেকোনো পরিমাণ অর্থ দিতে রাজি হন এবং বলেন যে বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নিতে যা যা প্রয়োজন তা করতে হবে।

তবে এই উচ্চাভি প্রজেক্টের কাজ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় উনিশশত আশি সালে ইরান ও ইরাকের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধ চলাকালীন ইরাকের মরুভূমির মাঝে প্রায় একশত চল্লিশ জন বিদেশি কলাকুশলী নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল কারণ চারপাশেই তখন আসল বোমা ও যুদ্ধবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হচ্ছিল। যুদ্ধের কারণে বেশ কয়েকবার珍惜 সিনেমার শুটিং সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছিল, তবে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ ছিল যেন বাইরের বিশ্বের কাছে এমন একটি ভাবমূর্তি বজায় রাখা হয় যে ইরাকের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।

চলচ্চিত্রটির দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় একের পর এক অদ্ভুত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা আসতে শুরু করে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ব্রিটিশ প্রধান তারকা অলিভার রিডের চরম বিশৃঙ্খল ও অসংলগ্ন আচরণ। একদিন বাগদাদের একটি বিলাসবহুল হোটেলের রেস্তোরাঁয় মদ্যপ অবস্থায় তিনি একটি খালি ওয়াইনের বোতলে প্রস্রাব করে তা ওয়েটারের মাধ্যমে পাশের টেবিলের অতিথিদের কাছে পাঠিয়ে দেন। এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় ইরাকি মন্ত্রী ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং প্রযোজককে অবিলম্বে ওই প্রধান অভিনেতাকে সিনেমা থেকে বাদ দিয়ে দেশছাড়া করার নির্দেশ দেন, কিন্তু জোরফানি কঠোর পরিশ্রম করে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই বিশাল অর্থ ব্যয়, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৈরি হওয়া চলচ্চিত্রটি কেন আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। উনিশশত তিরাশি সালের জুলাই মাসে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রথমবার প্রদর্শিত হয় এবং সেখানে একটি বিশেষ পুরস্কারও লাভ করে। কিন্তু এর পরপরই রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে সিনেমাটি আর সাধারণ দর্শকদের জন্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্রটির মূল রিলগুলো ইংল্যান্ডের সারে অঞ্চলে প্রযোজক লতিফ জোরফানির গ্যারেজে বাক্সবন্দী অবস্থায় দশকের পর দশক ধরে চরম অবহেলিতভাবে পড়ে থাকে।

banner
Link copied!