ইউক্রেনীয় বাহিনী গত সপ্তাহে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগর সংলগ্ন ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে সফলভাবে বিচ্ছিন্ন করে সেখানে তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করেছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে. ইউক্রেনের চালকহীন বিমান বা ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ম্যাডিয়ার ব্রোভদি জানিয়েছেন যে গত ৬ জুলাই থেকে মলোচকা নামের এই বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু হয়. এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আজভ সাগর এবং ভলগা-ডন খালের অগভীর পানিতে চলাচলকারী রাশিয়ার ছোট ছোট ট্যাংকার ও বার্জগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা, যা কৃষ্ণসাগরে অপেক্ষমাণ বড় বড় রুশ জাহাজে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে থাকে. ইউক্রেনের এই সর্বাত্মক হামলার কারণে অধিকৃত ক্রিমিয়ায় জ্বালানি তেলের আমদানি ও রাশিয়ার তেল রপ্তানি ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে.
এই বিশেষ অভিযানের প্রথম ১০ দিনে অর্থাৎ ৬ জুলাই থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে ইউক্রেনীয় ড্রোন বাহিনী রাশিয়ার ছায়া বহরের প্রায় ১৪৭টি তেলবাহী ট্যাংকারে সফলভাবে আঘাত হেনেছে. এর মধ্যে ১১৭টি ট্যাংকার আজভ সাগরে এবং বাকি ৩০টি কৃষ্ণসাগরে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে. গত ১৩ জুলাই সোমবারের মধ্যে কার্চ প্রণালীর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার সমস্ত নৌ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্রিমিয়ায় তেল খালাসের পরিমাণ সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে. পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ক্রিমিয়ার রুশ নিযুক্ত مقرر করা গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হন এবং স্বীকার করেন যে তারা এখন আর প্রতিদিন পাম্পগুলোতে পেট্রোল সরবরাহ বা নির্দিষ্ট সময়সূচী মেনে জ্বালানি বিতরণ করতে পারছেন না.
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ গত ১৩ জুলাই রাতে কার্চ প্রণালীতে সামরিক সরঞ্জাম বহনের জন্য ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ফেরি এবং তেল সংরক্ষণাগারে একযোগে হামলা চালায়. একই সাথে ক্রিমিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে গত ৯ জুলাই সাকি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে এবং ১০ জুলাই ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সাবস্টেশনে ড্রোন হামলা চালানো হয়. এরপর ১৩ জুলাই আরও ৯টি সাবস্টেশন এবং রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের কুবান থেকে ক্রিমিয়ায় বিদ্যুৎ স্থানান্তরের প্রধান গ্রিডটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়. ইউক্রেনীয় কমান্ডারের মতে এই ধারাবাহিক ধ্বংসাত্মক হামলার কারণে ক্রিমিয়ায় একটি সম্পূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা ব্ল্যাকআউট এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে.
চরম সংকটের মুখে রুশ গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ ক্রিমিয়ার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের জন্য কিছু জরুরি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন যার মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে ৪,০০০ গ্যাস সিলিন্ডার বিতরণ এবং ঋণের কিস্তি নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা. রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই উপদ্বীপের জন্য বিশেষ আর্থিক ভর্তুকি অনুমোদন করলেও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা তাদের কাছে নেই. যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নজিরবিহীন ড্রোন অবরোধের ফলে সামনের দিনগুলোতে রাশিয়ার মূল যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক রসদ সরবরাহ কতটা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং তা ক্রেমলিনের যুদ্ধনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে. রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সাথে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় ক্রিমিয়ার সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন.
ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কি জানিয়েছেন যে ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তারা মোট ৭,০২৮টি সফল মধ্যম পাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছেন যার মধ্যে মে মাসে ২,০০০টি এবং জুন মাসে ৩,৮০০টি হামলা চালানো হয়েছে. এই অভিযানের পরিধি আরও বাড়িয়ে গত ৭ জুলাই রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যবর্তী তুর্কস্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের প্রধান কম্প্রেসর স্টেশনটি উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ইউক্রেনীয় বাহিনী, যা বছরে প্রায় সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ঘনমিটার সরবরাহ করে থাকে. পাইপলাইনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম দাবি করেছে যে তারা এর আগেও গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে তিনটি অনুরূপ হামলা নস্যাৎ করেছিল. এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মস্কোয় সাংবাদিকদের বলেন যে ইউক্রেনীয় শাসকগোষ্ঠী যা করছে তা এখন আর জলদস্যুতা নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ ও প্রত্যক্ষ সন্ত্রাসবাদ.
