বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। একই সঙ্গে তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকা থেকে পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে বলেও নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের সভাপতিত্বে গঠিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটি এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন দেশটির লোকসভায় উপস্থাপন করে।
ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে আবেদন পাঠানো হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে। কমিটি জানিয়েছে যে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া ও রায়ের পর বাংলাদেশ যে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে, তা তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নোট করেছে। পাশাপাশি এই বিষয়ে বিবেচনার সামগ্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে কমিটিকে নিয়মিত অবহিত করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান দেশটির প্রাচীন সভ্যতাগত মূল্যবোধ এবং সংকটাপন্ন বা অস্তিত্বগত হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় প্রদানের মানবিক ঐতিহ্যের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই মানবিক আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে একটি কঠোর নীতি সর্বদা বজায় রাখা হয়, যার মাধ্যমে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ভারত সরকার অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করেছে যে শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ বা সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভারত তার দীর্ঘদিনের এই নীতিতে পুরোপুরি অটল রয়েছে যে তাদের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়াকরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় জনমত ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এর ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক ও আগের মতো গতিশীল করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরেই শেষ হতে চলায়, সরকারকে কোনো প্রকার বিলম্ব না করে অবিলম্বে ঢাকার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার তাগিদ দিয়েছে শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে চুক্তিটির মেয়াদ দুই হাজার ছাব্বিশ সালে শেষ হতে চলে এবং এর নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কমিটি হালনাগাদ জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য পূর্বাভাসের আলোকে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের রাজ্য সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করে এই নবায়ন আলোচনা দ্রুত শুরু করার সুপারিশ করেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
