বিগত সাতটি বিশ্বকাপের চারটিতেই ফাইনাল খেলেছে ফ্রান্স। গত তিন দশকে বিশ্বমঞ্চে লে ব্লুজদের মতো ধারাবাহিক আধিপত্য আর কোনো দেশ দেখাতে পারেনি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তাদের সামনে রয়েছে দুটি বড় লক্ষ্য। প্রথমত, ১৯৩৮ সালের ইতালির ভিত্তোরিও পোজোর পর ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়া এবং দ্বিতীয়ত, পশ্চিম জার্মানি ও ব্রাজিলের পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়া। ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে বিশ্বজয়ের স্বাদ পাওয়া দিদিয়ে দেশম ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল নাম। আগামী জুলাইয়ে চুক্তি শেষ হতে যাওয়া দেশমের ১৪ বছরের দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারের এটিই সম্ভবত শেষ অধ্যায়। ইউরো ২০২৪-এ ফ্রান্সের নিষ্প্রাণ ফুটবলের পর দেশম এবার দলকে সাজিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এবং গতিশীল কৌশলে।
আক্রমণভাগে ওসমানে দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিসের মতো তারকারা থাকায় ফ্রান্স এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ ও ভয়ংকর স্কোয়াডে পরিণত হয়েছে। ট্রান্সফারমার্কেটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৯ জন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ের সম্মিলিত বাজার মূল্য প্রায় ৮২৫ মিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমানে দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং দেজিরে দুয়ে—এই চারজনের বাজার মূল্যই আনুমানিক ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো, যা পুরো ব্রাজিল দলের আক্রমণভাগের সম্মিলিত মূল্যের চেয়েও বেশি। এই শক্তিশালী আক্রমণভাগের পেছনে রক্ষণ সামলানোর দায়িত্বে রয়েছেন উইলিয়াম সালিবা, যার কারণে বাছাইপর্বে ফ্রান্স মাত্র চারটি গোল হজম করেছে।
দলের এত তারকার ভিড় থাকলেও ফ্রান্সের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে ধরা হচ্ছে লেফট-ব্যাক পজিশন। লুকাস দিনিয়ে এবং থিও হার্নান্দেজ দুজনেই রক্ষণভাগের চেয়ে আক্রমণে উঠে যেতে বেশি পছন্দ করেন। অন্যদিকে, রক্ষণভাগে যিনি সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য, সেই লুকাস হার্নান্দেজ দীর্ঘ সময় ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করছেন। লেফট-ব্যাকের এই দুর্বলতা সম্প্রতি আইভরি কোস্টের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ফুটে উঠেছে, যেখানে ফ্রান্স শেষ মুহূর্তের গোলে পরাজিত হয়েছিল। যদিও সালিবার মতো ডিফেন্ডারদের বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই হার কোচিং স্টাফদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
কিলিয়ান এমবাপ্পে এই টুর্নামেন্টে বড় বড় রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনি ৪৪ ম্যাচে ৪২টি গোল করেছেন। গত দুটি বিশ্বকাপে তার করা ১২টি গোল বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতে এমবাপ্পের প্রয়োজন আর মাত্র ৪টি গোল। একই সঙ্গে তিনি অলিভিয়ে জিরুর করা ফ্রান্সের সর্বোচ্চ ৫৭ গোলের রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় আছেন। তার সঙ্গে ওসমানে দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিসের মতো খেলোয়াড়রা ফর্মে থাকায় ফ্রান্সের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে।
দেশের দীর্ঘতম দায়িত্ব পালন করা কোচ হিসেবে দিদিয়ে দেশম এখন নিজেকে প্রমাণ করার শেষ সুযোগ খুঁজছেন। ২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনা এখনো ফরাসিদের মনে দগদগে। বাছাইপর্বে ইউক্রেনকে ৪-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করা ফ্রান্স দল এখন মানসিকভাবে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। বিগত দুই আসরের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স কি পারবে প্যারিসে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের ট্রফি নিয়ে ফিরতে? উত্তর পেতে ফুটবল ভক্তদের অপেক্ষা করতে হবে টুর্নামেন্টের শেষ দিন পর্যন্ত।
