মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার লড়াইয়ের বিশ্লেষণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৯, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার লড়াইয়ের বিশ্লেষণ

ছবি : সংগৃহীত

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ২০২৬ সাল একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল থেকে রেকর্ড সংখ্যক আটটি দল অংশগ্রহণ করছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আলজেরিয়া, মিশর, ইরাক, জর্ডান, মরক্কো, কাতার, সৌদি আরব এবং তিউনিসিয়া এই বিশ্বকাপে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে প্রস্তুত। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর অভাবনীয় সাফল্য, যেখানে তারা প্রথম আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল, তা এই অঞ্চলের দেশগুলোর আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করেছে। এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আরব বিশ্ব এখন কেবল অংশগ্রণকারী নয়, বরং নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে।

অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে আলজেরিয়া দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফিরেছে। আলজেরিয়া তাদের সোনালী প্রজন্মের শেষ সুযোগটি কাজে লাগানোর অপেক্ষায় আছে। দলটিতে রিয়াদ মাহরেজের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় যেমন আছেন, তেমনি মোহাম্মদ আমোরার মতো তরুণ তুর্কিও দলের আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তবে তাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো রক্ষণভাগের দুর্বলতা। কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ দলকে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু গোলরক্ষক পজিশনে অনিশ্চয়তা তাদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রুপ জে-তে আর্জেন্টিনা এবং অস্ট্রিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। তবে জর্ডানের বিপক্ষে আরব ডার্বিতে জয়লাভ করলে নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।

অন্যদিকে মিশরের গল্পটি কিছুটা ভিন্ন এবং রোমাঞ্চকর। আফ্রিকার ফুটবলে মিশর এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস বা আফকন শিরোপা সাতবার জেতা মিশরের জন্য বিশ্বকাপ যেন এক ধাঁধার নাম। এত সাফল্য পাওয়ার পরেও বিশ্বকাপে তাদের কোনো জয় নেই। এই বিষয়টি নিয়ে মিশরের সমর্থকদের মধ্যে এক ধরণের আক্ষেপ কাজ করে। এবারের বিশ্বকাপে তাদের লক্ষ্যটা একটু অন্যরকম। অন্যান্য দলের মতো তারা হয়তো সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখছে না, বরং বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয়টি তুলে নেওয়াকে তারা বড় অর্জন হিসেবে দেখছে। মিশরের আক্রমণভাগ অত্যন্ত বিধ্বংসী, যা যেকোনো রক্ষণভাগকে তছনছ করে দিতে সক্ষম। তাদের খেলার মান এবং অভিজ্ঞতার মিশেল এবার তাদের প্রথম জয়ের স্বাদ এনে দিতে পারে কিনা, তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

বাকি দলগুলোর জন্য এই বিশ্বকাপ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সৌদি আরব এবং কাতার তাদের আগের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আরও বড় কিছু করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। মরক্কো তাদের ধরে রাখা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। তিউনিসিয়া, ইরাক এবং জর্ডান তাদের শক্তির জায়গাগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছে। এই আটটি দেশের অংশগ্রহণে ফুটবল বিশ্বে একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে। মরক্কোর সেমিফাইনালে খেলার সেই সাফল্য পুরো অঞ্চলকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। এখন আর কোনো আরব দল বিশ্বকাপ খেলতে আসে কেবল অংশ নেওয়ার জন্য, বরং তারা এখন জয়ে বিশ্বাসী।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে পরিবেশ এবং জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আটটি দলের প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন খেলার ধরণ ও কৌশল নিয়ে খেলবে, যা টুর্নামেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। বিশেষ করে মরক্কোর দেখানো পথে হেঁটে অন্য দলগুলো যদি নকআউট পর্বে তাদের জায়গা করে নিতে পারে, তবে তা আরব ফুটবলের জন্য এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করবে। খেলার মাঠে এখন কেবল কৌশল নয়, বরং মানসিক শক্তির পরীক্ষাও হবে। আরব সমর্থকরা আশা করছেন, এবার অন্তত কয়েকটি দল তাদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে যাওয়ার মতো কিছু করবে।

পরিশেষে, এই আটটি দলের অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার দিক থেকেই বেশি নয়, বরং গুণগত মানেও তারা আগের চেয়ে উন্নত। আলজেরিয়া বা মিশরের মতো দেশগুলো যদি তাদের রক্ষণাত্মক ও কৌশলগত ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে, তবে বড় অঘটন ঘটানো অসম্ভব নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য নিজেদের ফুটবলীয় সামর্থ্য প্রমাণ করার এক বড় মঞ্চ। সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী মানুষ এখন তাকিয়ে আছে এই আরব দেশগুলোর দিকে, যারা ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে উত্তর আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছে।

banner
Link copied!