বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্বকাপের ট্র্যাজেডি: অপরাজিত থেকেও বিদায়ের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১১, ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

বিশ্বকাপের ট্র্যাজেডি: অপরাজিত থেকেও বিদায়ের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

ছবি : সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ইতিহাসে হারের অর্থ সব সময় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নয়। সাধারণ দর্শক বা ভক্তদের মনে একটি বদ্ধমূল ধারণা থাকে যে একটি ম্যাচ হারলেই বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠে, কিন্তু পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায় বিষয়টি সব সময় এত সরল নয়। বিশ্বকাপের ব্যাকরণ কিছুটা ভিন্ন। অনেক দল টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ম্যাচেও হারেনি, তবুও তাদের ট্র্যাজিক বিদায়ের স্বাদ নিতে হয়েছে। টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষা যেহেতু দাপ্তরিকভাবে ড্র হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই অপরাজিত থেকেও বিদায় নেওয়া দলগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ১৯টি ঘটনার নজির রয়েছে যেখানে কোনো দল একটি ম্যাচও হারেনি, কিন্তু তবুও তাদের হাত থেকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ২০১০ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের পারফরম্যান্স। সেবার ইতালি, প্যারাগুয়ে এবং স্লোভাকিয়ার সাথে ড্র করে কোনো ম্যাচ না হারার কৃতিত্ব দেখায় কিউইরা। এমন বিরল অর্জনের পরেও গোল ব্যবধান বা পয়েন্টের মারপ্যাঁচে তাদের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৮ সালে বেলজিয়াম গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচে হারেনি, অথচ নেদারল্যান্ডস ও মেক্সিকোর চেয়ে পিছিয়ে থাকায় তাদেরও বাড়ি ফিরতে হয়েছিল।

টাইব্রেকারের নিষ্ঠুর নিয়মের বলি হয়েছে ইতিহাসের অনেক শক্তিধর দল। ২০১৪ এবং ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যায়। লুই ফন গালের অধীনে ডাচ বাহিনী বিশ্বকাপে টানা ম্যাচে অপরাজিত থেকে সেমিফাইনাল বা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায় হেরে তাদের অপরাজিত থাকার গৌরব ধুলোয় মিশে যায়। স্পেনের মতো চ্যাম্পিয়ন দলও এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। ২০০২ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে নির্ধারিত সময়ে কোনো ম্যাচ না হেরেও তাদের টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয়েছিল।

অন্যদিকে ফুটবল ইতিহাসে কিছু দলের জন্য অপরাজিত থাকাটা শিরোপা জয়ের সমার্থক ছিল। ব্রাজিলের পাঁচবার বিশ্বজয়ের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তাদের অপরাজিত থাকার ধারাবাহিকতা। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালের প্রতিটি বিশ্বকাপ অভিযানে ব্রাজিল একটি ম্যাচেও হার মানেনি। একইভাবে জার্মানি ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালের চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল সম্পূর্ণ অপরাজিত থেকে। ইতালির চারবার বিশ্বজয়ের ইতিহাসও একই ধরনের। প্রতিটি আসরে তারা কোনো ম্যাচ না হেরেই সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, ফুটবল মাঠে জয় বা পরাজয় সব সময় পারফরম্যান্সের মানদণ্ড নয়। অনেক সময় নিখুঁত ফুটবল খেললেও ভাগ্য সহায় না হলে মাঠ ছাড়তে হয়। যেমন ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে আর্জেন্টিনা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আবার সেই একই আর্জেন্টিনা ২০০৬ সালে হোসে পেকারম্যানের অধীনে পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকেও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। ফ্রান্স ১৯৯৮ এবং ২০১৮ সালে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে, কিন্তু ২০০৬ সালে ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

ফুটবল বিশ্বকাপের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, নিখুঁত ফুটবল খেলা আর ট্রফি জেতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। মাঝে মাঝে ভাগ্য নামক অনুষঙ্গটি পুরো টুর্নামেন্টের চিত্রপট বদলে দেয়। কিছু দল অপরাজিত থেকে অমরত্ব লাভ করে, আবার কিছু দলকে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিতে হয়। মাঠের সেই মুহূর্তগুলোই ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় রূপ দিয়েছে। প্রতিটি আসরেই নতুন কোনো দল হয়তো এই তালিকার কোনো একটি জায়গায় নিজের নাম লেখাবে, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, শেষ হাসিটা হাসার জন্য অনেক সময় প্রতিভার চেয়েও ভাগ্য বেশি প্রয়োজন।

banner
Link copied!