আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার এক অনন্য নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন বলে বিবিসি নিউজ এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ম্যাচের প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি কিক মিস করার চরম মানসিক ধাক্কা সামলে দ্বিতীয়ার্ধে এক দৃষ্টিনন্দন ফিল্ড গোল করে তিনি এই অসাধারণ কীর্তি অর্জন করেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টের পরবর্তী রাউন্ডে বা শেষ বত্রিশের নকআউট পর্বে নিজেদের স্থান সুনিশ্চিত করেছে। ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভ-এর বিখ্যাত ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার অ্যালিস্টেয়ার ব্রুস-বল এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে এই খুদে জাদুকরের ক্যারিয়ারে আরেকটি অনন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার এই অবিশ্বাস্য গৌরব অর্জন করলেন এই ৩৮ বছর বয়সী ফুটবল মহাতারকা। মেসির আগে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন কেবল দুজন কিংবদন্তি ফুটবলার। তারা হলেন ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে জাস্ট ফন্টেইন এবং ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে জাইরজিনহো। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর এই দুই ফুটবল ঈশ্বরকে স্পর্শ করে নিজের নামকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার এই আধুনিক জাদুকর। তার এই গোলটি আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতায় তাকে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে।
ম্যাচের শুরুর দিকে একটি অত্যন্ত দুর্বল শট নিয়ে পেনাল্টি মিস করার কারণে ডালাসের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার আকাশী-নীল সমর্থকের মাঝে এক গভীর হতাশা ও নীরবতা তৈরি হয়েছিল। গ্যালারির সেই তীব্র মানসিক চাপ ও উত্তেজনাকে মুহূর্তের মধ্যে এক বিশাল উল্লাসে রূপান্তর করে মেসির এই নান্দনিক ফিল্ড গোল। এই অনন্য সাধারণ গোলটির পর আর্জেন্টিনা দল পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় এবং অস্ট্রিয়ার শক্তিশালী রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত আধিপত্য বজায় রাখে। চোটের কারণে এই ম্যাচে নিয়মিত রক্ষণভাগের গঞ্জালো মন্তিয়েল খেলতে না পারায় একাদশে নাহুয়েল মলিনাকে নামিয়েছিলেন প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার এই আক্রমণাত্মক কৌশল এবং প্রধান খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দলের তরুণ ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজ এবং মাঝমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিগো ডি পল মাঠের ভেতরে অধিনায়কের চারপাশে যে চমৎকার সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিলেন তা মেসির খেলাকে আরও সহজ করে তুলেছে। গত ম্যাচে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক করার পর এই ম্যাচেও মেসির গোল পড়ার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে তিনি তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপেও সর্বোচ্চ ফর্মে রয়েছেন। এই জয়ের পর আর্জেন্টিনা দলের অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা তাদের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানকে আরও বেগবান করবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বর্তমান সূচি এবং দলের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ আমেরিকার এই পরাশক্তিরা আগামী দিনগুলোতে তাদের কৌশলগত প্রস্তুতি আরও জোরদার করবে। ডালাসের এই ঐতিহাসিক রাতটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের স্মৃতিতে দীর্ঘকাল অমলিন থাকবে কারণ তারা ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের এক নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ার সাক্ষী হয়েছেন। এই আসরে মেসির মোট গোল সংখ্যা এখন ১৭ টিতে পৌঁছেছে যা তাকে বিশ্বমঞ্চে এককভাবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বব্যাপী ক্রীড়া বিশ্লেষকরা এখন থেকেই পরবর্তী রাউন্ডের ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রতিপক্ষ এবং মেসির সম্ভাব্য নতুন কোনো জাদুর অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন।
