চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে সেনেগালকে তিন-দুই ব্যবধানে হারিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করার পর নরওয়ে দলের ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং রো উদযাপনের ইতিহাস মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সঙ্গে অত্যন্ত কঠিন গ্রুপ থেকে টানা দুই ম্যাচ জিতে প্রথমবার শেষ বত্রিশ তথা নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে ইউরোপের উদীয়মান পরাশক্তি নরওয়ে। দীর্ঘ আটাশ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরেই এমন অনবদ্য সাফল্যে এখন ভাসছে পুরো নরওয়ে। বাঁচা-মরার ঐতিহাসিক ম্যাচে সেনেগালকে পরাজিত করার পর মাঠের ভেতরেই নিজেদের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবের মাধ্যমে কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করে নিয়েছে আরলিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের দল।
বিশ্বকপের মূল আসরে দলের এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর টুর্নামেন্টের আয়োজক শহরগুলোতে হাজার হাজার নরওয়েজিয়ান সমর্থক জড়ো হয়ে এই অনন্য উদযাপনে মেতে উঠছেন বলে জানা গেছে। এই বিশেষ উদযাপনে খেলোয়াড়রা মাঠের ওপর সারিবদ্ধভাবে বসে প্রাচীন ভাইকিং যুদ্ধজাহাজের মতো একটি সমন্বিত ফরমেশন তৈরি করেন এবং দুই হাত দিয়ে বৈঠা চালিয়ে তা এগিয়ে নেয়ার ভঙ্গি প্রদর্শন করেন। গত ম্যাচে জয়ের পর দলের অধিনায়ক ও প্রধান মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ড ছিলেন এই উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে, যিনি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সজোরে ড্রাম বাজিয়ে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে এক রণধ্বনি প্রতিধ্বনিত করছিলেন। গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার সমর্থকও খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে এই দাঁড় টানার ভঙ্গি অনুকরণ করেন, যা বিশ্ব ফুটবলের নতুন ফ্যান কালচারে রূপ নিয়েছে। মাঠের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘকাল মনে থাকবে এবং এটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এই বিচিত্র উদযাপনের মাধ্যমে মূলত নরওয়ের সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ইতিহাস, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং দলগত একতা ও শক্তির প্রতীক ফুটিয়ে তোলা হয় বলে ফুটবল গবেষকরা মনে করেন। অতীতে অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমুদ্রপথে দূরপাল্লার যুদ্ধ অভিযানের জন্য বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত ও বিখ্যাত ছিল এই ভাইকিং যোদ্ধারা। প্রাচীনকালে তারা যখন পাল গুটিয়ে তাদের দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে তীরের দিকে আসত, তখন যুদ্ধের ঠিক আগের মুহূর্তে সবাই মিলে একসঙ্গে প্রচণ্ড শক্তিতে দাঁড় টানত। মাঠের এই সমন্বিত উদযাপনটি দুই হাজার ষোলো সালের ইউরো কাপে আইসল্যান্ডের বিখ্যাত থান্ডার ক্লাপসের মতোই অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ভাইকিং রো উদযাপনের ইতিহাস মূলত তাদের পূর্বপুরুষদের সেই রণকৌশল ও সাহসিকতাকে স্মরণ করার একটি আধুনিক মাধ্যম।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে নরওয়ে এই জয়ের ধারা কতটা বজায় রাখতে পারবে। ফরাসি দলটির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বে লড়াকু পারফরম্যান্স দেখানোর পর এখন তাদের নিয়ে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। দলের প্রধান তারকা আরলিং হালান্ড গোল্ডেন বুটের দৌড়ে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন এবং তার এই ফর্ম নরওয়েকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, আটাশ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ের এই বীরত্বপূর্ণ উত্থান বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। সমর্থকদের এই বিপুল উদ্দীপনা এবং খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্স আগামী দিনগুলোতে তাদের আরও বড় সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয় হলো শেষ বত্রিশের কঠিন লড়াইয়ে তারা এই ভাইকিং শক্তির কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারে।
