জার্মানি ফুটবল দল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে চার-তিন ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে বলে বিবিসি স্পোর্টস এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। নির্ধারিত এবং অতিরিক্ত সময়ের খেলা এক-এক গোলে সমতায় থাকার পর পেনাল্টি শুটআউটে দক্ষিণ আমেরিকান দলটির কাছে এই অপ্রত্যাশিত পরাজয় বরণ করতে হয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। জার্মান পত্রিকা বিল্ড এই ঘটনাকে জার্মানির ফুটবলের পরবর্তী দুঃস্বপ্ন হিসেবে তাদের প্রধান শিরোনামে উল্লেখ করেছে। এর আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি কখনোই পেনাল্টি শুটআউটে কোনো ম্যাচ হারেনি। ফিফা র্যাংকিংয়ের ৪১তম স্থানে থাকা প্যারাগুয়ের কাছে ১০ম স্থানে থাকা জার্মানির এই বিদায় দলটির কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানের ভবিষ্যৎকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
বোস্টনের মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে জার্মানি পুরো সময়ের ৭৫ শতাংশ বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও প্যারাগুয়ের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। উল্টো ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রাইটন ও ইপসউইচের সাবেক খেলোয়াড় হুলিও এনসিসোর গোলে আকস্মিকভাবে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। অবশ্য দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আর্সেনালের তারকা কাই হাভার্টজের একটি canny বা চমৎকার হেডার গোল জার্মানিকে সমতায় ফেরায়। এর কিছুক্ষণ পর জোনাথন তা হেডের মাধ্যমে আরও একটি গোল করলেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে সতীর্থের ফাউলের কারণে সেই গোলটি বাতিল করা হয়। জার্মান ফুটবল বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত বিতর্কিত বলে বর্ণনা করেছেন যা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।
বিশ্বকাপের পেনাল্টি শুটআউটে এর আগে চারবার অংশ নিয়ে প্রতিবারই জয় পাওয়া জার্মানি এবার টাইব্রেকারের শুরুতেই ধাক্কা খায়। প্রথম শট নিতে আসা কাই হাভার্টজের শট প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিল দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন এবং নিউক্যাসলের খেলোয়াড় নিক ভল্টমেডের শটটিও তিনি প্রতিহত করেন। প্যারাগুয়ের দুটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় জার্মানি ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেলেও জোনাথন তা নিজের শটটি বারের ওপর দিয়ে মারেন। শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হোসে কানাল সফল পেনাল্টি শটের মাধ্যমে দলের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন। ম্যাচ শেষে অত্যন্ত হতাশ জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান স্বীকার করেন যে প্যারাগুয়ের মতো দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং জার্মানি এখন আর বিশ্বের প্রথম সারির দলগুলোর মধ্যে পড়ে না।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানির কোচের দায়িত্ব নেওয়া নাগেলসম্যানের অধীনে দলটি ঘরের মাঠে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে জার্মানি প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে সাত-এক গোলে বিধ্বস্ত করে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে আইভরি কোস্টকে দুই-এক গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করেছিল। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে দুই-এক ব্যবধানে পরাজয়ের পর নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই প্যারাগুয়ের কাছে এই ব্যর্থতা নাগেলসম্যানকে চাকরিচ্যুতির মুখোমুখি করেছে। জার্মানির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ইতিমধ্যে লিভারপুলের সাবেক ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপকে জাতীয় দলের প্রধান কোচ করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
সাবেক জার্মান রক্ষণভাগের খেলোয়াড় আরনে ফ্রিডরিশ বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে পুরো টুর্নামেন্টে দলের খেলার ধরণ বিবেচনা করলে এই পরাজয় সম্পূর্ণ প্রাপ্য ছিল। নাগেলসম্যানকে অবশ্যই এই ব্যর্থতার দায় এবং পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে এবং জাতীয় দলের আগামী যাত্রা নাগেলসম্যানকে ছাড়াই শুরু হওয়া উচিত। সাবেক মিডফিল্ডার টমাস হিৎজলসপার্গার বিবিসি ওয়ান চ্যানেলে মন্তব্য করেন যে এত সমস্যা নিয়ে জার্মানি কীভাবে এই টুর্নামেন্টে প্রবেশ করল তা ব্যাখ্যা করা কঠিন এবং এই ধরনের বড় দলের জন্য এত দ্রুত বিদায় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যা কম স্পষ্ট তা হলো জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাৎক্ষণিকভাবে কোচ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেবে নাকি আগামী দিনগুলোতে নাগেলসম্যানকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেবে। ম্যাচ শেষের পরপরই নাগেলসম্যানকে তার পদত্যাগ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে।
