ভারতের টাটা ইলেকট্রনিক্সে একটি বড় ধরনের সাইবার হামলার মাধ্যমে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের আসন্ন আইফোন ১৮ প্রো মডেলের গোপন নকশা ও যন্ত্রাংশের তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে বলে মঙ্গলবার রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী ওয়ার্ল্ড লিকস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং তারা প্রায় ৬৩০ গিগাবাইট গোপন কর্পোরেট তথ্য ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ তথ্যের মধ্যে ২ লাখেরও বেশি ফাইল রয়েছে যা অ্যাপলের অত্যন্ত সুরক্ষিত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। সাধারণত অ্যাপল তাদের নতুন ডিভাইসের নকশা ও উৎপাদন অংশীদারদের নাম বাজারে আসার আগে অত্যন্ত গোপনে রাখে। তবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে উন্মুক্ত হতে যাওয়া নতুন এই স্মার্টফোনের খুঁটিনাটি তথ্য সময়ের আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ফাঁস হওয়া নথিপত্রগুলোর মধ্যে আইফোন ১৮ প্রো মডেলের মাদারবোর্ডের সার্কিট নকশা, ব্যাটারির যন্ত্রাংশ এবং ক্যামেরার মডিউলের বিস্তারিত প্রযুক্তিগত বিবরণ রয়েছে। এর পাশাপাশি কোন যন্ত্রাংশ কোন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপলকে সরবরাহ করে এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশের চুক্তির জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করছে সেই গোপন তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে। প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপি ফোরসাইটের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশিষ্ট বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতোর এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে সুনির্দিষ্ট ছবির চেয়েও সরবরাহকারী এবং উপাদান সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া অ্যাপলের জন্য অনেক বড় সংকটের কারণ। তার মতে এই ঘটনাটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান, জালিয়াত চক্র এবং অসৎ উদ্দেশ্যপণোদিত ব্যক্তিদের অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ কাঠামো এবং এর দুর্বলতাগুলো জানার একটি বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।
এই সাইবার হামলাটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে টাটা ইলেকট্রনিক্স ইতিমধ্যে তাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে এবং একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ফরেনসিক তদন্ত শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এই ধরনের একটি বিশাল তথ্য চুরি সাধারণ কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। হ্যাকাররা দীর্ঘ সময় ধরে নেটওয়ার্কের ভেতরে অবস্থান করে এবং দুর্বল প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করেছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে একটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা আসলে তার সবচেয়ে দুর্বল সংযোগের সমান শক্তিশালী। হ্যাকার গোষ্ঠী ওয়ার্ল্ড লিকস মূলত একটি র্যানসমওয়্যার চক্র যারা তথ্য চুরির পর মুক্তিপণ দাবি করে এবং অর্থ না পেলে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়। এর আগে তারা ডেল এবং নাইকির মতো বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যও একইভাবে চুরি করেছিল এবং এবার তাদের তালিকায় অ্যাপলের পাশাপাশি টেসলা, কোয়ালকম এবং তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রতিষ্ঠানের নামও জড়িয়েছে।
তবে এই হ্যাকিংয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের কোনো ব্যক্তিগত তথ্য বা পেমেন্ট সংক্রান্ত বিবরণ চুরি হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অ্যাপল জুনের শুরুতে গ্রাহকদের জন্য বেশ কিছু সফটওয়্যার আপডেট নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছিল যা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত গতির সাইবার নিরাপত্তা উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। এই সংকটের কারণে অ্যাপল এবং টাটা ইলেকট্রনিক্স উভয় প্রতিষ্ঠানেরই সুনাম ও পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ডিভাইস উৎপাদনের জন্যচীনের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে ভারতে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করছে এবং টাটা ইলেকট্রনিক্স এই পরিকল্পনার একটি প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
ঠিক এই সংবেদনশীল সময়ে তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি ভারতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং সাইবার নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ এবং চিপের বৈশ্বিক ঘাটতির কারণে অ্যাপল তাদের ম্যাকবুকসহ বিভিন্ন হার্ডওয়্যার পণ্যের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে এই চিপ সংকটের মধ্যে নতুন তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি আসন্ন আইফোনের বাজার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নিরাপত্তা লঙ্ঘনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অ্যাপল ও টাটা ইলেকট্রনিক্সের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অ্যাপলের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করবে।
