কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো খাতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কারণে গত এক দশকে প্রথমবারের মতো নেতিবাচক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো বা নগদ অর্থের প্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে অপারেশন ও বিনিয়োগের পেছনে অর্থ পরিশোধের পর কোম্পানির হাতে থাকা ফ্রি ক্যাশ ফ্লো বা অবশিষ্টাংশ মাইনাস পাঁচ দশমিক নয় বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। প্রযুক্তি জগতের এই নতুন বিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, এটি তারই এক বিশাল আর্থিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
চলতি বছরে অ্যালফাবেটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে মোট ব্যয় বেড়ে প্রায় দুইশ পাঁচ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা এর আগে একশ নব্বই বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছিল। এদিকে গত প্রান্তিকে কোম্পানির মোট রাজস্ব বা আয় একশ উনিশ দশমিক আট বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তেইশ শতাংশ বেশি। রাজস্ব বৃদ্ধির পরেও এই বিশাল বিনিয়োগের খবরের পর পুঁজিবাজারে গুগলের শেয়ারের দর পতনের মুখোমুখি হয়েছে এবং লেনদেন শেষে কোম্পানির শেয়ারের দাম চার শতাংশ কমে গেছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক বৈঠকে অ্যালফাবেটের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা আনাত আশকানাজি জানিয়েছেন যে মূলধন ব্যয়ের বৃদ্ধির কারণেই কোম্পানির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো নেতিবাচক হয়েছে এবং এর প্রায় পুরোটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যয় করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে কোম্পানিটি দ্বিতীয় প্রান্তিকে পঁয়তাল্লিশ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যার ষাট শতাংশ গেছে সার্ভার ক্রয়ে এবং বাকি চল্লিশ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ডেটাসেন্টার নির্মাণে। এআই প্রযুক্তির চাহিদা এখনো বিনিয়োগের পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং লাভজনক সুযোগ না আসা পর্যন্ত এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান যে এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জনের পরিকল্পনা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়েছে। ব্যবহারকারীদের জন্য এই প্রযুক্তির সক্ষমতাকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সেবায় রূপান্তর করার জন্য এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় নিয়ে কিছুটা অবাক হয়েছেন এবং কোম্পানির শেয়ারের দরপতনের পেছনে এই উদ্বেগের প্রভাব রয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাজার বিশ্লেষক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কিলিক অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার রাচেল উইন্টার মন্তব্য করেছেন যে বিনিয়োগকারীরা গুগলের এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন। দুইশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এই মোট ব্যয়ের অঙ্ক অনেক বড় হওয়ায় লেনদেনের সমাপনীতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। কেবল গুগল নয়, ইলন মাস্কের নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টেসলাও তাদের বিনিয়োগ খরচ বৃদ্ধির কারণে দ্বিতীয় প্রান্তিকে এক দশমিক এক বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ঘোষণা করেছে।
টেসলার প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা বৈভব তানেজা বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছেন যে তাদের কোম্পানি একটি বড় বিনিয়োগ চক্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং চলতি বছরে তাদের ব্যয় পঁচিশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। প্রযুক্তি খাতের এই দুই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় এবং নেতিবাচক নগদ প্রবাহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় নতুন অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যেভাবে তাদের আর্থিক সংস্থান ঝুঁকিতে ফেলছে, তা আগামী দিনে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমানে নজিরবিহীন আর্থিক ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
